অন্ধকারের তারাদের গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘টুইঙ্কল টুইঙ্কল লিটল স্টার
হাউ আই ওয়ান্ডার হুয়াট ইউ আর
আপ এভোব দ্য ওয়াল সো হাই
লাইক আ ডায়মন্ড ইন দ্য স্কাই’

এভাবেই ইংরেজি কবিতা বলছিলো সাভারের দ্বিতিয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট্ট শিশু হেলেনা। বড় হয়ে সামর্থহীনদের ফ্রি চিকিৎসা দিতে চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা তার। রাজধানী ঢাকার অদূরে সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের কাছে বংশাই নদীর পাড়ে বাঁশ আর পলিথিন দিয়ে বানানো ঘরে বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস তার।

নিজের ও পরিবারের সম্পর্কে বলতে বললে হেলেনার মন্তব্য, ‘আমার নাম হেলেনা। আগে পরে কিছু নাই। আমরা ৪ ভাইবোন। মা কইছে আমার বয়স ৭ বছর। আব্বা কামলা দেয়। আর মা এলাকায় ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করে। আর তাই হেলেনা দ্রুত বড় হতে চায়, বাবা মায়ের কষ্ট লাঘব করতে চায়।’

শুধু হেলেনা নয় ১৯৯৮সালে বন্যায় সবকিছু হারিয়ে ফেলার পর সাভারের এই জায়গাটিতে এসে বসবাস করা আরো প্রায় ২২টি পরিবারে এরকম আরো ৩০-৪০ জন শিশু এমন ভাবেই বেড়ে উঠছে। হেলেনা স্কুলে যেতে পারলেও বেশিরভাগ শিশুই বাবা-মায়ের কম আয়ের কারণে স্কুলে না গিয়ে ভাসমান শিশুর মতো বেড়ে উঠছে। তবে সব শিশুরই স্বপ্ন জীবনে ভালো মানুষ হয়ে বেড়ে উঠে দেশের জন্য ও পরিবারের জন্য কিছু করার। কিন্তু অনেক পারিবারেরই ধারণা, পড়ালেখা করানোতে অনেক খরচ যা তাদের আয় থেকে ব্যয় করা সম্ভব নয়।

এখানকারই এক ঝুপড়ির বাসিন্দা নজর উদ্দিন। যার নিজের বাড়ি ছিলো জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার টাটাপাড়া গ্রামে। ১৯৯৮ এর বন্যায় নদীতে বাড়িঘর সব তলিয়ে গেলে নতুন করে কিছু করতে সাভারের এই এলাকায় এসে ঠাঁই নেন তিনি।

নজর উদ্দিন বলেন, নদীতে সব তলিয়ে যাবার পর আমিসহ ওই এলাকার প্রায় ৪০-৪২টা পরিবার এখানে চলে আসি। ভাবছিলাম কাজ জুটিয়ে এখানেই কিছু একটা করবো। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই সামর্থ্য হয়নি। কিছুদিন আগের বন্যায় পানি আসলে এখানকার ২০টা পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেয়া হয়। জানালেন, প্রায় সব পরিবারেই একাধিক ছেলেমেয়ে রয়েছে।

এলাকাটিতে ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের কাছে বংশাই নদীর পাশে ২২টি পরিবার ঝুপড়ি ঘর করে বাস করছে। যেখানে প্রায় ৩০-৪০ জন শিশু রয়েছে। এদের মধ্যে ১৫ জন শিশুর বয়স ৫ বছরের কম আর বাকিরা ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সের। যাদের কারোর কাছেই কোন জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট নেই। এমনকি তাদের বাবা-মাও সন্তানের সঠিক জন্ম তারিখ জানেন না।

অন্যদিকে এলাকাটিতে ঘুরে দেখা যায়, ২২ পরিবারের প্রায় ১০০ মানুষ এখানে বাস করলেও তাদের জন্য নেই স্বাস্থ্য সম্মত কোন পায়খানা। নেই কোন বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও। একারণে নিয়মিত নানা পেটের অসুখেও ভুগছেন এখানকার বাসিন্দারা।

নজর উদ্দিন বলেন, একজন বিদেশি এসে গতবছর ৩টা পাকা পায়খানা আর একটা টিউবওয়েল করে দিয়েছিলো। কিন্তু এটায় এতোজনের হতো না। আর এখন টিউবওয়েলটার পানিও পানের যোগ্য নেই। এসময় এবিষয়ে দায়িত্বশীলদের দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান তারা।

এখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিবার পরিকল্পনা নিয়েও সচেতন নন কেউই। একারণে অপরিকল্পিত সন্তান ধারণ ও কম বয়সে সন্তান ধারণের কারণে নানা সমস্যায় ভোগেন নারীরা। এছাড়াও জানা যায়, এখানকার অনেক বাসিন্দা মনে করেন জন্মনিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন পদ্ধতি নিলে তাদের শারীরিক অসুস্থতা হতে পারে। এছাড়া এসবে প্রচুর খরচও হয়। যা তাদের পক্ষে নির্বাহ করা সম্ভব নয়।

এখানকারই বাসিন্দা মাজেদা। যিনি ২৫ বছর বয়সেই ৩ সন্তানের মা হয়েছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার মনে হয় জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খেলে আমার স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। আর প্রচুর দামিও। এজন্য আমি কোনদিন এটি ব্যবহার করিনি। আর এসব কীভাবে কাজ করে তাও জানি না।

পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে জানাতে কোনদিন কোন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এসেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনদিনই কেউ এসে এসব বলেনি।

এবিষয়ে জানতে চাইলে সাভার উপজেলা শিক্ষা অফিসার তাবসিরা ইসলাম লিজা বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি সেখানকার শিশুদের ব্যাপারে দ্রুত খোঁজখবর নিবো। এবং তাদেরকে শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসবো।

এবিষয়ে জানতে চাইলে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: সায়েমুল হুদা বলেন, আমরা জানি না যে এখানে এভাবে কিছু পরিবার ও শিশু রয়েছে। যাহোক আমি দ্রুত সেখানে যাবো। এবং সেখানে ভিটামিন, জিংক ওরাল স্যালাইন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট দিয়ে আসবো। আর দ্রুত সময়ের মধ্যে সেখানে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়েও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন খান নঈম বলেন, দেশের প্রত্যেক শিশু ভবিষ্যতের সম্পদ। তাদের মৌলিক অধিকার পূরণে দেশ ও সমাজকে দায়িত্ব নিতে হবে। এজন্য এসব শিশুদের মৌলিক অধিকার পূরণে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাচ্ছি যেনো কেউ অবহেলিত না থাকে।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: