‘আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত, ক্ষমাপ্রার্থী’

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিষেধাজ্ঞা থেকে ক্রিকেটে ফেরার পর থেকে নানা ইস্যুতে সাকিব আল হাসান ‘টক অব দ্য টাউন’।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আইসোলেশন না করা, করোনা টেস্ট না করিয়ে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সুপারশপ উদ্বোধন করতে যাওয়া নিয়ে সাকিব হৈ চৈ ফেলে দেন সর্বত্র। সম্প্রতি ভারত যাওয়ার পথে বেনাপোলে সেলফি তোলায় এক ভক্তের মোবাইল আছাড় মেরে ভাঙেন সাকিব।

গণমাধ্যমে এসেছে, উত্তর কলকাতায় কাঁকুড়গাছি ‘আমরা সবাই সার্বজনীন শ্যামাপূজা’ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। এ নিয়ে সাকিবের সমালোচনা হচ্ছে প্রবল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভে এসে সাকিবকে প্রক্যাশে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে নানা ইস্যুতে সাকিব হয়ে উঠছিলেন বিতর্কিত।

নিজের অবস্থান ব্যখ্যা করতে সাকিব বেছে নেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। আজ (সোমবার) সন্ধ্যায় ইউটিউবে ৭ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডের ভিডিও পোস্ট করেছেন সাকিব। যেখানে কলকাতার অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ায় সাকিব দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থণা করেন।

ভিডিওতে সাকিব বলেন, ‘ঘটনাটি অবশ্যই স্পর্শকাতর। তবে আমি শুরুতে বলে নিতে চাই, আমি নিজেকে একজন গর্বিত মুসলমান বলে মনে করি। আমি সেটা পালন করার চেষ্টা করি। তবে ভুল ত্রুটি হবে, আর এই ভুল ত্রুটি নিয়েই আমরা জীবনে চলাচল করি। আমার কোনো ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে আমি তার জন্য আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এমনকি আপনাদের মনে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকলেও তার জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’

পূজার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ নিয়ে সাকিব নিজের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘পূজার বিষয় নিয়ে নিউজ কিংবা গণমাধ্যমে যে খবর এসেছে, আমি পূজা উদ্বোধন করতে গেছি! কিন্তু সেটার (পূজা উদ্বোধন) জন্য আমি আসলে যাই নি, করিও নি। এটার প্রমাণ আপনারা অবশ্যই পাবেন।’

‘ওইখানে অনেক সাংবাদিক ভাই-বোনেরা উপস্থিত ছিলেন, যাদেরকে হয়তো বা নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। এছাড়াও যদি আপনারা নিমন্ত্রণের কার্ডও দেখেন, কার্ডে আসলে লেখা আছে যে, আসলে কে ওইটার উদ্বোধন করেছে। উদ্বোধন হয়েছে আসলে আমি যাওয়ার আগেই। যে জায়গায় বা মঞ্চে অনুষ্ঠানটি হয়েছে, সেটি কখনোই পূজা মণ্ডপ ছিলো না এবং পাশে আরেকটি মঞ্চ ছিল, সেখানে করা হয়েছিল এবং পুরো অনুষ্ঠানটি আসলে সেখানে হয়। প্রায় ৪০-৪৫ মিনিট ব্যাপী সেই অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম। আর সেখানে কোনো ধর্ম, বর্ণ কোনো কিছু নিয়ে কখনো কথা হয়নি ‘

‘অনুষ্ঠান শেষে যখন আমার গাড়িতে উঠতে হবে, যেহেতু ওইখানে পাশেই আসলে পূজার আয়োজন ছিল অনেকগুলো রাস্তা আসলে বন্ধ ছিল। স্বাভাবিকভাবে পূজা মণ্ডপটি পার করে আমায় যেতে হতো, যেটি আমি গিয়েছি। যাওয়ার সময়, পরেশ দা (পরেশ পাল) যিনি আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তার অনুরোধে আমি প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করি। যেহেতু কলকাতায় (কলকাতা নাইট রাইডার্স) আমি অনেকদিন খেলেছি, কলকাতার মানুষরা আমাকে অনেক পছন্দ করে, ওইখানকার সাংবাদিকরা অনেক উৎসুকও ছিল, সবার অনুরোধে তখন পরেশ দার সঙ্গে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের সময় একটা ছবি তোলা হয়।’

‘ছবি তোলা শেষে যাওয়ার সময়, সাংবাদিকদের সঙ্গে আমার নিরাপত্তায় যারা ছিল, তাদের কিছুটা বাকবিতণ্ডাও হয়, একটু হাতাহাতিও হয়। সেই ঘটনার জন্য আমরা ওইদিক দিয়ে আর যেতে পারি নাই। পরে আবার ব্যাক করে অন্য রাস্তা দিয়ে গিয়েছি। তো পুরো ঘটনা ছিল এরকম যে, যার মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট আমরা আমাদের জন্য যে মঞ্চ করা হয়েছিল, সেখানে ছিলাম এবং আমি আবারও বলছি, সেখানে কোনো ধর্ম, বর্ণ নিয়ে কথা হয়নি এবং এটি তেমন কোনো প্রোগ্রামও ছিল না।’

‘দুই মিনিটের যে সময়টা আমি পূজা মণ্ডপে ছিলাম, সেটি নিয়ে সবাই বলেছে এবং ধারণা করছে যে, আমি পূজার উদ্বোধন করছি। সেটি আমি কখনোই করিনি এবং একজন সচেতন মুসলমান হিসেবে আমি করবো না। তারপরও হয়ত সেখানে যাওয়াটাই আমার ঠিক হয়নি, সেটা যদি আপনারা মনে করে থাকেন তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী। আমি মনে করি, আপনারা এটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সেটিও চেষ্টা করবো।’

‘আমি আপনাদের জানানোর জন্য কিছু তথ্য দিয়ে দিতে চাই। আমার কাছে নিমন্ত্রণের কার্ডটাও আছে। কে আসলে পূজার উদ্বোধক ছিলেন সেটিও বলে দেই। উদ্বোধক ছিলেন, ফিরহাদ হাকিম, প্রশাসনিক প্রধান, কলকাতা পৌরসভা, মন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার।আমি ওই অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে তিনি পূজার উদ্বোধন করে গেছেন। তারপরে আমি গিয়েছি, অনুষ্ঠানে যোগ করেছি, পরেশ দার অনুরোধে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেছি এবং সাংবাদিকদের অনুরোধে উনার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আমি ছবিটি তুলেছি।’

‘হ্যাঁ, আসলে আপনারা ব্যাকগ্রাউন্ড বিবেচনা করেই হয়ত, উত্তেজনা অনুভব করেছেন বা ভেবেছেন ঘটনাটি ওটাই হয়েছে। আসলে একটি ছবি দেখে আপনি পুরো ঘটনা কখনো পুরো অনুমান করতে পারবেন না বলে আমার মনে হয়। তারপরও আমার কখনো কোনো উদ্দেশ্য ছিলো না যে, আমার ধর্মকে ছোট করে অন্য ধর্মকে বড় করবো, এরকম কোনো বিষয়ও ছিলো না।’

‘আমার মনে হয়, ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম। আমার যদিও জ্ঞান খুবই কম, আমি তাও চেষ্টা করছি, ভবিষ্যতেও আরও চেষ্টা করবো, ইসলাম সম্বন্ধে যেন আরও জ্ঞান নেওয়া যায়। ইসলামের নিয়মানুযায়ী যেন আমি চলতে পারি। হ্যাঁ, সবসময় আমি এটা করতে পারি নি বা এখনো পারি না। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য আছে ভবিষ্যতে আমি সবকিছু মেনে চলবো।’

‘আমি শুধু একটি কথাই বলবো যে, এমন কিছু যেন আমরা না করি, যেটাতে মানুষ আমাদের দ্বিধা দ্বন্দ্বে ফেলে দেয় যে, আমরা কী এক নাকি আলাদা। কারণ, আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত এক থাকবো, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা শক্তিশালী। আমরা বিভিন্ন উদাহরণ চাইলেই দিতে পারি, আমি নিজেই অনেক উদাহরণ দিতে পারি। কিন্তু আমি সেসব দিতে চাই না। আমি আশা করি, আমরা মুসলমান যারা আছি, তারা সবসময় এক থাকবো আমরা। আমাদের এক থাকা জরুরী, আমাদের একতা খুবই জরুরী। যখনই আমরা আলাদা আলাদা হয়ে যাবো, তখনই আমরা দুর্বল। যতক্ষণ আমরা এক থাকবো, ততক্ষণ আমরা শক্তিশালী।’

‘এমনি আপনারা অনেকে আছেন, যারা অনেক জ্ঞানী, অনেক জানেন, তাদের ভালো ভালো পরামর্শ গুলো আমি অবশ্যই শোনার চেষ্টা করবো। কেউ যদি আমাকে ভালো কিছু জানাতে চান বা জানাতে পারেন, তাহলে সেটি আমি সাদরে গ্রহণ করবো।’

‘দুই এক জায়গায় আমি দেখছি যে, আমি আসলে খুব একটা এসব দেখি না, ফোকাস করি না। অনেকে আমাকে… আসলে যেহেতু এখন সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ, অনেক কিছু চাইলেও এড়ানো সম্ভব না। আমার নামের সামনে যেহেতু অনেকে শ্রী শ্রী, সিঁদুর, প্রদীপ মন্দির অনেক কিছু দিয়ে দিয়ে অনেক কিছু বলছেন, এটাতে আসলে আমরা আমাদের ধর্মকে কতটা উপরে নিচ্ছি না নিচে নামচ্ছি, সেটা আমার বোধগম্য না। আশা করি, সবাই আমরা আমাদের জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবো। আমি তারপরও আবারও সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, আর আমি চেষ্টা করবো, দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার।’

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: