আশুলিয়ায় কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে নষ্ট হচ্ছে ফসল

নিজস্ব প্রতিবেদক

সাভারের আশুলিয়ায় শিল্প কারখানার বিষাক্ত কেমিকেল বর্জ্যের কারণে বোরো মৌসুমে ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কায় রয়েছেন একটি ইউনিয়নের কয়েক’শ দরিদ্র কৃষক। বছরের পর বছর কেমিকেল মিশ্রিত পানি ফসলি জমিতে প্রবেশ করায় পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়ে ও মাটির উর্বরতা হারিয়ে একেবারেই কমে গেছে ফলন। অনেকেই চাষাবাদ ছেরে কাজ করছেন দিনমজুর হিসেবে। এদিকে কারখানার বিষাক্ত কেমিকেল বর্জ্য ফসলি জমি নষ্টের পাশাপাশি পরিবেশের মারাত্মক দূষণ করছে। দূষণের কবলে খালের মাছ সহ বিভিন্ন জলজ প্রাণি মরে যাওয়ায় হুমকিতে পড়েছে জীববৈচিত্র।

এছাড়া বিষাক্ত এই কেমিকেল ফসলি জমি হয়ে ফুড চেইনের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগ সৃষ্টি করছে বলে দাবী পরিবেশবিদদের। স্থানীয় কৃষক ও এলাকাবাসী বারবার প্রতিকার চাইলেও উপজেলা কৃষি বিভাগসহ স্থানীয় প্রশাসন কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় টনক নড়েনি কারখানা কতৃপক্ষের।

আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়নের গোহাইলবাড়ী মেশিনপাড় এলাকায় জিটিএ স্পোর্টস লিমিটেড নামে একটি ডায়িং কারখানার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষক ও এলাকাবাসী।

গোহাইলবাড়ী এলাকার কৃষক আমান উল্লাহ আমান অভিযোগ করে বলেন, জিটিএ কারখানা কতৃপক্ষ সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবে বিষাক্ত কেমিকেল মিশ্রিত পানি ছেরে দেওয়ায় তাদের শত শত বিঘা কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে। গত ৮-১০ বছর পূর্বেও বোরো মৌসুমে তারা বিঘা প্রতি ৩০-৪০ মণ ধান পেতেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বিঘা প্রতি তারা মাত্র ৭-৮ মণ ধান পাচ্ছেন। লোকসানের কারণে অনেকেই চাষাবাদ বাদ দিয়ে দিনমজুরের কাজ করছেন। কিন্তু তার মত অনেকেই অন্য পেশা না জানায় ক্ষতির মুখে বাধ্য হয়েই চাষাবাদ করছেন। এ বিষয়ে কারখানার কতৃপক্ষের সাথে দেখা করতে গেলে তাদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাত করতে দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ তার।

স্থানীয় কৃষক মোনতাজ মন্ডল অভিযোগ করে বলেন, এ বছর বোরো মৌসুমে দেড় বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন তিনি। কিন্তু ওই কারখানার ডায়িংয়ের ময়লাযুক্ত পানি সরাসরি ক্ষেতে প্রবেশ করায় তাদের ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জমিতে কেমিকেল বর্জ্যরে অধিক পরিমাণ কাঁদা জমে মাটির উর্বরতা হারিয়ে যাচ্ছে। শুরুতে ধানের গোছা মোটা ও সবুজ দেখালেও বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসে সামান্য বৃষ্টিতেই ধান ঝরে যায়। পাশাপাশি ক্ষেতে প্রচুর পরিমাণে পোকামাকড়ের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। উপজেলা কৃষি অফিস ও বাজার থেকে কেনা কীটনাশনক প্রয়োগ করেও কোন ফল মিলছে না। এছাড়াও দূর্গন্ধযুক্ত কাঁদামাটির আধিক্যের কারণে গবাদি পশু দিয়ে ক্ষেতে হালচাষসহ স্বাভাবিক কাজ করা তাদের জন্য দূরহ হয়ে পড়েছে। কারখানা কতৃপক্ষ, উপজেলা কৃষি অফিস ও প্রভাবশালীদের কাছে তারা অনেকবার বলেও কোন প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জিটিএ কারখানার পিছনের পুকুরে জমিয়ে রাখা দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্য মিশ্রিত কালো পানি।

এলাকাবাসী আব্দুল খালেক ও সুলতান মিয়া জানান, এক সময় এই খালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ এখানে মাছ ধরতো। কিন্তু কারখানার বিষাক্ত কেমিকেল মিশ্রিত পানির কারণে মাছ দূরের কথা খালে এখন কোন জলজ প্রাণিও চোখে পড়ে না।

তবে জিটিএ স্পোর্টস লিমিটেড কারখানার এইচআর ম্যানেজার মতিউর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তারা কারখানার কেমিকেল মিশ্রিত বর্জ্য ইটিপির মাধ্যমে শোধন করেই নির্গত করছেন বলে দাবী করেন। যদিও কারখানার পেছনের অংশে বিরাট একটি পুকুরে জমিয়ে রাখা দূর্গন্ধযুক্ত কালো পানির ব্যাপারে কোন সদোত্তর দিতে পারেননি তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মোহাম্মদ তারেক বলেন, কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ফসলি জমি থেকে খাদ্যচক্রের বিষক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগের সৃষ্টি করে। তাই সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, কেমিকেল মিশ্রিত বর্জ্য ইটিপিতে শোধনের পরই যাতে শিল্প কারখানা গুলো তা পরিবেশে ছারে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরকে কার্যকরী ভ‚মিকা রাখতে হবে। এমনকি যে সব কারখানা তা অমান্য করে পরিবেশ দূষণ করবে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে সাাভার উপজেলা কৃষি অফিসার নাজিয়াত আহমেদ শিমুলিয়া ইউনিয়নের ওই গ্রামের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের পাশে থেকে সার্বিক সহযোগিতার আস দিয়েছেন।

অপরদিকে গার্মেন্ট কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে পরিবেশ অধিদপ্তরের বিধি অনুযায়ী এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আশুলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভ‚মি) তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ জানান।

এনআই/শিরোনাম বিডি

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: