এক পুলিশ কর্মকর্তা বদলে দিয়েছেন বেদেদের জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ পুলিশের আইকন হিসেবে পরিচিত ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান। সৎ, সমাজের প্রতি নিবেদিত ও একজন ভালো মানুষ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে আদর্শ উদাহরণ তিনি। তার গড়া উত্তরণ ফাউন্ডেশন বদলে ফেলছে সাভারের অন্তত ২০ হাজার বেদে সমাজের মানুষের জীবন। আলোচিত ফাউন্ডেশন ও এই পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে শিরোনাম বিডির আজকের বিশেষ…

২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সাভারের মাটিতে পা রাখেন পুলিশের আইকন খ্যাত এই পুলিশ কর্মকর্তা। বিখ্যাত ও সফল মানুষ হাবিবুর রহমান, বিপিএম (বার), পিপিএম (বার) বাংলাদেশ পুলিশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম সর্বোচ্চ পদ ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি (ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ) পদে চাকরি করেন।

যেভাবে সৃষ্টি উত্তরণ ফাউন্ডেশন
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে হাবিবুর রহমান ২০১৪ সালের ১৮ অক্টোবর প্রথম মতবিনিময় সভাটি করেছিলেন সাভার মডেল থানার অফিসার ও কনস্টেবলদের নিয়ে। অনেকবার খবর এসেছে তার কাছে,মাদক অপরাধীদের হাতেনাতে ধরা হয়েছে। আরো নানা ধরণের অন্যায়, অপরাধে যুক্ত তারা। কেউ চিঁছকে চোর, ছিনতাইকারী। কেউবা পথের মানুষ। পরে জেনেছেন, তাদের বেশিরভাগই একটি এলাকায় বাস করেন। পেশায়ও তারা সুপ্রাচীন, বাংলার ঐতিহ্য তবে মান-সম্মান, জীবন ও সম্পদ খুইয়ে এখন অপাংক্তেয় শ্রেণী। এই দেশ তাদের স্বীকার করলেও সাহায্য তেমন করে না। চেনেন সবাই ‘বেদে’।

সাভারের মূল উপজেলা সাভার-এ থাকেন তারা। চারটি গ্রামে ছড়িয়ে আছেন বক্তারপুর, পোড়াবাড়ি, আমরপুর ও কাঞ্চনপুর। এখানে বংশী নদীর ধারে, নদীকে ঘিরে জীবন তাদের। তাও অন্তত দেড়শ বছর ধরে বাস। পুরো দেশে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত কোনো ঋতুতেই তাদের নৌকা থামেনি। ২০-২৫ নৌকায় প্রতিটিতে পাঁচ থেকে ছয়জনের এক একটি পূর্ণ জীবন। মেয়েরা নৌকা থেকে কাঁধে ঝুলি নিয়ে নেমেছেন কোনো না কোনো জনপদের ধারে, গ্রামের পাশে; হাটে-বাজারে। পুরুষরা তখন সংসার ও নৌকা সামলেছেন। ‘এই সাপের খেলা দেখাই’, ‘লাগবোনি কো ঝাঁড়-ফুক?’ বলে কল্লোল স্বরে হাটে, ঘাটে নেমেছেন তারা। মানুষের দলে মিশেছেন। সব জাতভাই- বোনদের মতো বংশীর এই সন্তানেরাও ঝাঁড়-ফুঁক; তাবিজ, তুমার; সিঙ্গা লাগানো, দাঁতের পোকা ফেলা, সাপের খেলা দেখানো ও পুরুষরা মিলে সাপ ধরার কাজ করেছেন। তবে ধীরে ধীরে বংশী মরেছে, তারা লেখাপড়া করতে পারেননি এত বছরেও। উন্নত জীবন পাননি কোনো। তাই চলে গিয়েছেন অপরাধের দিকে।

পুলিশের কাছে খবর আসে, গ্রামে গ্রামে নারীরা আগের মতোই জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে গেলেও পুরুষরা তখন একেবারে বেকার। সন্তানের দেখাশোনার কাজ তারা করেন ঠিকই; কিন্তু অলসতা, অভাব, বাজে সঙ্গ ও পরিবেশ তাদের নিয়ে গেল অপরাধের অন্যায় ভুবনে। মাদক বিক্রির অপরাধে জড়িয়ে গেলেন তারা। তাদের এলাকাতেই প্রকাশ্যে ও আড়ালে বিক্রি করেন মাদক, নিজেরাও সেবন করেন। অভাব, অপরাধ তাদের নিত্যসঙ্গী। পরিবারে বিবাদ, কলহ, একে অন্যকে মারধর করতে করতে জীবনটাই শেষ করে দিচ্ছিলেন তারা। অন্যের জন্যও হয়ে উঠছিলেন বিভীষিকা। টেকনাফ, উখিয়ার মতো মাদকের আন্তর্জাতিক অন্যায় পথগুলো ধরে বাংলাদেশে চালানের অন্যতম বাহক হয়ে চলছিলেন মেয়েরাও। ফলে পুলিশের খাতায় তারা এলেন ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে।

বিরাট এই জনগোষ্ঠীর অন্তত ২০ হাজারের মানুষের বাস এখন সাভারের চারটি গ্রামে। গরীবের গরীব মানুষগুলো। নৌকাতে, ডাঙাতে মাচা বানিয়ে থাকেন। চাল নেই, চুলো নেই। প্রথম সভাতেই হাবিবুর রহমান তাদের অনুরোধ করলেন, করজোরে মানা করলেন এবং জেল, শাস্তির ভয় দেখালেন। বেদে সর্দাররা ছিলেন তাতে। রুজির ব্যবস্থা করে দিলে আমরা ফিরে আসবো স্বাভাবিক জীবনের কথা দিলেন তারা। ফলে কাজ শুরু করলেন তিনি, তার বাহিনী ও বন্ধুরা। দফায়, দফায় পুলিশ ও বেদে সর্দার, সাধারণ বেদেনী, বেদের সঙ্গে আলাপ হলো। প্রায় সবকটিতেই ঢাকা থেকে গিয়েছেন তিনি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এখন স্বর্ণযুগ চলছে, ফলে কুপমন্ডুকতার পেশা ছেড়ে, লোভের ও অজ্ঞানতার পথ ছেড়ে চলে আসুন। অভাব, জীবনের তাড়না ও লেখাপড়ার কোনো সুযোগ; জীবনের কোনো ভালো ব্যবস্থা না থাকা চোখে পড়লো বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর। সাভারের বিরাট বেদে পল্লীর জীবনটিকে বদলাতে মাঠে নামলেন তারা একজন সৎ, যোগ্য এবং মানবদরদী পুলিশ কর্মকর্তার ডাকে। সেই তিনিই গড়ে তুললেন ‘উত্তরণ ফাউন্ডেশন’।

উত্তরণ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম

বেদে ও হিজড়া জনগোষ্ঠির টেকশই জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে গড়ে তোলা হয় উত্তরন ফাউন্ডেশন। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডিআইজি হাবিবুর রহমান। পাঞ্জেরী পাবলিকেশনের চেয়ারম্যার কামরুল হাসান শায়ক ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সব ধরনের কাজেই তিনি আর্থিকভাবে সহায়তা করে থাকেন। সরকারীভাবে জয়েন স্টক থেকে রেজিস্ট্রেশন করা ফাউন্ডেশনটির রয়েছে বিভিন্ন পেশার ৯ সদস্যের পরিচালনা কমিটি। তারা সবাই এখানে সহযোগীতা করে থাকেন। এছাড়াও সংগঠনটি বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী সংস্থা এবং বিশিষ্টজনদের কাছ থেকে সহযোগীতা নিয়ে বেদে ও হিজড়াদের উন্নয়নের কাজে ব্যয় করেন।

আবাসন

সাভারের খঞ্জনকাঠিতে (পোড়াবাড়ি) উত্তরণ ফাউন্ডেশন মোট সাড়ে তিন একর জায়গা সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প হিসেবে বরাদ্দ নিয়েছে। তাতে ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রবল প্রাকৃতিক তান্ডবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সক্ষম দুর্যোগ সহনীয় মোট ৫০টি ঘর তৈরী করা হচ্ছে উত্তরণ পল্লী নামে। ফলে আর প্রকৃতির কাছে হেরে যাবেন না প্রকৃতির সন্তানেরা। সেখানে পথের মানুষ, ঠিকানাহীন বেদেদের জন্য গুচ্ছ গ্রাম তৈরি হচ্ছে। তাদেরসহ বাংলাদেশের প্রাচীন, অন্যরকম, প্রায় হারিয়ে যেতে থাকা নানা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সাভারের বেদে পাড়াতে নিজ উদ্যোগে জাদুঘর তৈরি করবেন ডিআইজি হাবিবুর রহমান। জীবন নিজেরাই যেন বদলাতে পারেন সাবেক ও এখন বেদের পেশায় থাকা মানুষগুলো সেজন্য তৈরি করে দিয়েছেন তারা পোড়াবাড়ি সমাজ কল্যাণ সংঘ সমবায় সমিতি।

শিক্ষা

গ্রামে আছে প্রথম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্র, ছাত্রীদের পড়ানোর জন্য উত্তরণ শিক্ষালয় নামে একটি পাঠশালা। বর্তমানে আড়াইশ ছাত্র-ছাত্রী এখানে পড়ছেন। অনেকে ভালো ফলাফল করে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে ভর্তি হয়েছেন। মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘উপবৃত্তি’ চালু আছে। মেধাবী এসব শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করছেন অন্যতম সেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা। লেখাপড়ার আলোয় আনার বিনিময়ে তারা একটি টাকাও কেউ নেন না। উত্তরণ ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে অত্র এলাকায় স্কুলটি তৈরির জন্য আমরপুরে ৩৮ শতক জায়গা কেনা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ১৯ সালের ২২ এপ্রিল ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন। তাতে তাদের জীবন বদলের নায়কের নামে ‘হাবিবুর রহমান প্রাথমিক বিদ্যালয়’ হবে। সরকারী অনুদানেই তৈরী হবে স্কুল ভবন।

পেশাগত ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন

এর আগে হাবিবুর রহমান ও তার সঙ্গীদের এই ফাউন্ডেশন ২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে মোট ১০৫ জন বেদেনীদের সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। পরের বছরের ২৮ এপ্রিল তারা প্রত্যেকে সহজ শর্তে সেলাই মেশিন উপহার পেলেন। শুরু হলো বাংলার সুপ্রাচীন হাতের কাজের মাধ্যমে নারীদের জীবন বদলের সেই ইতিহাস সমৃদ্ধ করার সংগ্রাম। পরে আরও এগিয়ে গেল ফাউন্ডেশন। ৩৫ জন বেদেকে দেওয়া হলো গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ। তাদের প্রত্যেককে যোগ্য করে ড্রাইভারের সরকারী লাইসেন্স দেওয়া হয়। অনেককে হাবিবুর রহমান ও অন্যরা প্রয়োজনে পুলিশ বাহীনিসহ সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়েছেন। ধীরে ধীরে তারা পুরো সমাজ ও জীবনকেই বদলে দেওয়ার সংগ্রামে নেমেছেন।

উত্তরণ ফাউন্ডেশন সাভারের পোড়াবাড়ি এলাকায় একটি ঈদগাহ তৈরি করে দিয়েছেন। তাদের নামাজ পড়ার জন্য একটি জামে মসজিদও গড়েছেন ‘হাবিবিয়া জামে মসজিদ’। সেখানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ তাদের নিয়মিত কার্যক্রম মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বছর ১৫ আগেও এই চার গ্রামের মানুষরা তাদের পরম আত্মীয়কে কোথাও কবর দিতে পারতেন না। আশপাশের মানুষ তাদের সমাজে ঠাঁই দিত না। তারাও এড়িয়ে চলতে চলতে পুরোপুরি সমাজ ছাড়া আলাদা এক সমাজের মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন। মৃতের লাশ চোখের জলে ভাসিয়ে দেওয়াই ছিল একমাত্র সৎকার ব্যবস্থা। নোংরা, কাদায় জল জমে চলাই ছিল দায়; সেখানে এখন ১৪টি ছোট-বড় সংযুক্ত পাকা পথ তৈরি হয়েছে। আছে বড় তিনটি ড্রেন। ‘উত্তরণ ফ্যাশন হাউস’ আছে। তাতে মোট ৮০ থেকে ১০০ জন বেদেনী গার্মেন্ট কর্মী হিসেবে চাকরি করছেন। ভালো কাজ শেখার পর ফাউন্ডেশন ৬০ জনকে অন্য আরও ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করেছে।

এই প্রতিষ্ঠানের শ্লোগান ‘নতুন প্রজন্মের ফ্যাশন জগতে এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী নাম’। এখন আর উত্তরণ ফাউন্ডেশনকে চালাতে হয় না। মাঝেমধ্যে দেখভাল করলেই হয়। তাদের পোশাক বিক্রি হয় সাভারের জামগড়া ও সিটি সেন্টারের সামনের ফাউন্ডেশনের গড়া ‘উত্তরণ বুটিক’ নামে দুটি আলাদা শো-রুমে। সেখানে কাজ করা সবাইও বেদে-বেদেনী।

এছাড়া তাদের পাড়াকে মাদক, সাপের খেলাসহ নানা অন্যায় থেকে বাঁচাতে পোড়াবাড়ি সমাজ কল্যাণ সংঘ’। তরুণ, সমাজপতিরা গ্রাম চারটিকে সংঘের মাধ্যমে অন্যায় থেকে বাঁচাচ্ছেন। আছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রর ‘উত্তরণ কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার’। পরিচালনা করে ফাউন্ডেশন। ছাত্র, ছাত্রী থেকে বয়ষ্ক সবাই কম্পিউটার শিখতে পারেন। ১০০ থেকে ১৫০ জন ছাত্র, ছাত্রী পাশ করে নানা পেশায় যোগ দিয়েছেন। তিন শিফটে তাদের মৌলিক ও অফিশিয়াল কাজগুলো শেখানো হয়। কোনো কাজ করতে পারেন না, এমন গরীব বৃদ্ধা, বৃদ্ধদের জন্য হাবিবুর রহমান সমাজসেবা অধিদপ্তরে যোগাযোগ করে বয়ষ্ক ভাতা চালু করেছেন। না খেয়ে আর মরছেন না এক কালের দূর্ধর্ষ এখন বোঝার মতো বয়ষ্করা।

ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হাবিবুর রহমান নিজ খরচে তিনটি বিয়ের যোগ্য বেদে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ১৮ বছরের বেশি বয়সের সব নারীর বিয়ের খরচ একসময় নিজেরা শত কষ্টেও চালিয়ে গিয়েছেন তারা। ফলে বাল্য বিয়ের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়েছে পুরো সমাজ। এই পর্যন্ত ২৫ জন বেদে তরুণকে ঢাকার ধামরাইয়ে অবস্থিত সজাগ ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা কাজ করে খাচ্ছেন।

প্রতি শীতে নিজের ও ফাউন্ডেশনের খরচে নিয়মিত তিনি ও তারা শীতবস্ত্র বিতরন করেন, নানা ধরনের রোগীদের চিকিৎসার খরচ ও তখন চলার পয়সা দেন। দুই ঈদ ও পহেলা বৈশাখে বেদে সম্প্রদায়ের লোকজনের মাঝে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়। এই উত্তরণ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এবং হাবিবুর রহমানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে মোট নয়জন বেদে-বেদেনী (১ জন নারী) বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে চাকরি করছেন। একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আছেন তাদের।

অন্য আরেকজন দি একমি ল্যাবরেটরিজের কর্মকর্তা। ঢাকার মিরপুরের শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজে অধ্যাপনা করেন জুলেখা বেগম। মুন্সিগঞ্জ থেকে এই বেদেনীকে ধরে এনে জীবনের আলো দিয়েছেন হাবিবুর রহমান। এখন তিনি বাংলাদেশের আলো হয়েছেন। আরেকটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ভালো পদে সেভাবে চাকরি পেয়ে খুব ভালো আছেন মাজেদা বেগম।

তারা বলেন, ‘কোনো অপরাধের শিকার হলে ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সাহায্য পান তারা। তারপরও কোনো অপরাধ করলে, তাদের অপরাধের প্রবণতা কমিয়ে আনতে পুলিশের ডিআইজি হাবিবুর রহমানের নির্দেশনায় সাভার মডেল থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিষয়গুলি গুরুত্ব সহকারে দেখভাল করেন। ফলে বদলে যাচ্ছে তাদের জীবন।

তাদেরই একজন অঞ্জলি বেগম, ‘আমার মতো অনেক বেদেনী, বেদে এখন সাভার, আমাদের গ্রামগুলোর বাজারে নানা ধরনের ছোট দোকানদার। বাড়িতে হাঁস, মুরগি পেলেও অনেকের ভাগ্য বদলে যাচ্ছে। অনেকের কাপড়ের দোকান, টেইলার শপ আছে। বিষধর বিষে এখন আমরা আর মরি না।’

ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক রমজান আহমেদ বলেন, ‘মানুষ চাইলে পুরো সমাজ বদলাতে পারে; পুলিশ আমাদের বন্ধু; তারা জীবনের সঙ্গীর সবই প্রমাণ করেছেন হাবিবুর রহমান স্যার তাদের উত্তরণ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে। তার গ্রামগুলোতে অনেকে জীবন বদল করে পাকা বাড়ি তুলেছেন। নিজেরা ভালো আছেন, ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হচ্ছে। তাদের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে পোড়াবাড়ী, সাভার পৌরসভার এই ঠিকানায় পোড়াবাড়িতে সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প চালু আছে।

সরকারীভাবে সুদহীনভাবে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ব্যবসা করে জীবন গড়ছেন অনেকে। তবে এখনো গ্রামগুলোতে রাস্তা পুরোপুরি ভালো হয়নি। ভালো পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থা নেই, মানুষ ভালো বাথরুম ব্যবহার করতে পারছেন না। কাজের ব্যবস্থা হয়নি সবার। বিশুদ্ধ পানি, গ্যাসের সুবিধা আসেনি। করবস্থান নেই বলে পাশের গ্রাম গুলোতে অনুরোধ করে লাশ দাফন করতে হয়। এখন তারা মানুষের কাতারে আসছেন বলে সম্মতি পান। ফাউন্ডেশন যেবাবে জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে তাতে কিছু দিনের মধ্যেই নিজেদেরকে সমাজের মূল স্ত্রোতে সম্পৃক্ত করাতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করে সবাইকে উত্তরণ ফাউন্ডেশনের সাথে থাকার জন্য অনুরোধ করেন রমজান আহমেদ।

পুলিশ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান

হাবিবুর রহমান ১৯৬৭ সালের পহেলা জানুয়ারী গোপালগঞ্জের চন্দ্র দিঘলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মরহুম আলী মোল্লার একমাত্র ছেলে এবং সবার বড় সন্তান ডিআইজি হাবিবুর রহমান। তবে তার রয়েছে আরও তিন বোন। এদের মধ্যে একজন ইউসিবি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত, একজন গৃহিনী এবং অন্য একজন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন। এছাড়া আফতান আফিফ নামে তিন বছরের একটি সন্তান রয়েছে এই পুলিশ কর্মকর্তার। তার সহধর্মিনী মিসেস ওয়াজেদ সামসুন্নাহার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাতালের বিসিএস ক্যাডারভুক্ত একজন চিকিৎসক।

ডিআইজি হাবিবুর রহমান ১৯৯৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ১৭তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। এরপর বাংলাদেশ পুলিশ এর বেশ কিছু গুরুত্বপুর্ণ পদে পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ঢাকা জেলায় পুলিশ সুপারিন্টেন্টে হিসেবেও কাজ করেন। কর্মক্ষেত্রে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে প্রশংসনীয় কৃতিত্বপূর্ণ কাজের জন্য তিনবার বাংলাদেশ পুলিশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও দুইবার রাষ্ট্রপতি পুলিশ পক (পিপিএম) পেয়েছেন। পুলিশ সপ্তাহ ২০১৭ উপলক্ষে ২০১৬ সালে প্রশংসনীয় ও ভাল কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে আইজিপি’স ব্যাজ প্রদান করা হয়।

পেশাগত কাজের বাইরে তিনি একজন ক্রীড়া সংগঠক। বাংলাদেশ কাবাডি ফেডারেশন এর সাধারণ সম্পাদক এবং এশিয়ান কাবাডি ফেডারেশনের সহসভাপতি এই পুলিশ কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি (উপ-মহাপরিদর্শক) হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে দ্বায়িত্বরত আছেন। এর পূর্বে তিনি ঢাকাস্থ সদর দপ্তরে উপ মহাপরিদর্শক (প্রশাসন-ডিসিপ্লিন) হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন।

হাবিবুর রহমানের শিক্ষা জীবন শুরু হয় গোপালগঞ্জের এর চন্দ্র দিঘলীয়া মোল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে তিনি গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পাঠ গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনিষ্টিটিউট থেকে তিনি স্নাতোকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর তিনি বিসিএস পরিক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের পুলিশ ক্যাডারের জন্য মনোনীত হন। পুলিশি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করা ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তা ও ভূমিকা তাকে এনে দিয়েছে বিশেষ খ্যাতি।

হাবিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরতে ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পেছনে ভূমিকা পালন করেন এবং সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দুই তলা বিশিষ্ট জাদুঘরটির বেজমেন্টে ‘বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’ এবং গ্রাউন্ড ফ্লোরে রয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু গ্যালারি’। বঙ্গবন্ধু গ্যালারির প্রবেশমুখে বঙ্গবন্ধুর দূর্লভ কিছু ছবি এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দুটি ডকুমেন্টারি। আর কাঁচের দেয়ালে ঘেরা বাক্সে থরে থরে সাজানো মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পুলিশ সদস্যদের ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি। এছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর অবদান ও ঢাকায় তাদের প্রথম প্রতিরোধ বিষয়ক ঘটনা নিয়ে তিনি ‘মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ’ নামে একটি বই লিখেছেন ডিআইজি হাবিবুর রহমান।

আইআই/শিরোনাম বিডি

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: