‘করোনা সরঞ্জাম’ সংকটে দুই সিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনা মোকাবিলায় ‘সরঞ্জাম’ সংকটে রয়েছে রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি)। এই মহামারি নিয়ন্ত্রণের জন্য শুরুতে দুই সিটি থেকে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল সেগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সংস্থা দুটির নিজস্ব কর্মীদের জন্য যেসব ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী দেওয়া হতো, এখন আর তাও দেওয়া হচ্ছে না। এ নিয়ে করপোরেশনের নিজস্ব কর্মীদের পাশাপাশি নগরবাসীর মাঝেও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, গত মার্চ মাসে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ার পর রোগটি নিয়ন্ত্রণে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল দুই সিটি করপোরেন। এজন্য পাবলিক প্লেস জীবাণুমুক্তকরণ, জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে হাত ধোয়ার বেসিন স্থাপন, লকডাউন বাস্তবায়ন, অসহায় ও কর্মহীন মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, সাধারণ ও করোনা বর্জ্য পৃথকভাবে অপসারণসহ যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, এখন তার সিংহভাগই বন্ধ করে দিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। পাশাপাশি নিজস্ব কর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য সুরক্ষাসামগ্রীও মজুত নেই সংস্থা দুটির ভাণ্ডার বিভাগে।

ডিএসসিসির ভাণ্ডার বিভাগের তৈরি করা এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলমান করোনা পরিস্থিতিতে এ পর্যন্ত ৭৯ হাজার ৯০০টি মাস্ক, ১৭ হাজার ১০০ জোড়া রাবার গ্লাভস, ২৯ হাজার ৫০০টি সার্জিক্যাল মাস্ক, ৫৩ হাজার ৩৬৮টি সাবান, ১৫ হাজার ৭৭৫টি হ্যান্ড স্যানিটাইজার, এক হাজার লিটার স্যাভলন, ব্লিচিং পাউডার ৫০ হাজার কেজি, সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইড এক লাখ লিটার, তিন লাখ পিস করোনাভাইরাস সচেতনতা লিফলেট ও ৫১০টি ডিসইনফেক্টটেন্ট স্প্রে সংগ্রহ করা হয়েছে।

এছাড়া সড়ক পরিষ্কার করার জন্য নারিকেল শলা ৫ হাজার কেজি, গামবুট দুই হাজার ৮৫০টি, মপ ক্যাপ ১৫ হাজার, ওয়ার্ম গ্লাভস ৫৪০টি, কে এ ৯৫ মাস্ক ১১০টি, কেএন ৯৫ (৩ এম) মাস্ক ৫০টি, ত্রিপল ১৫টি, সেফটি ড্রেস ৪০৪টি, হ্যান্ড গ্লাভস (চায়না) ৪ হাজার ৪৪০ জোড়া, মেডিক্যাল গগলস ১৫০টি, সেফটি গগলস ৭৫০টি, কমফোর্ট হ্যান্ড গ্লাভস (সার্জিক্যাল) এক হাজার জোড়া, মেডিক্যাল হ্যান্ড গ্লাভস (সার্জিকাল) এক হাজার জোড়া ও সাবান (কেয়া) দুই হাজার ১৬ পিস সংগ্রহ করা হয়েছে।

বর্তমানে এসব পণ্যের মধ্যে শুধু কাপড়ের দুই হাজার ৬২৫টি মাস্ক, ২০টি গাম বুট, ২০০টি ওয়ার্ম গ্লাফস ও ১০টি মেডিক্যাল গগলস সংস্থার ভাণ্ডার বিভাগে মজুত রয়েছে। এছাড়া করোনা সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য যে তিন লাখ লিফলেট সংগ্রহ করা হয়েছে, সেগুলোও সংস্থাটির ভাণ্ডার বিভাগে পড়ে আছে। করোনায় কর্মহীন মানুষের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হলেও এখন সেই উদ্যোগও বন্ধ রয়েছে।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার দফতরে গেলে তিনি কা বলতে রাজি হননি। তবে সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘এখন আর আগের মতো পরিবেশ নেই। সবকিছু উন্মুক্ত হয়ে গেছে। আমরা বিপুল সংখ্যক সুরক্ষা সামগ্রীও বিতরণ করেছি। এখন হয়তো কিছুটা কমে আসতে পারে।’

অপরদিকে, একই চিত্র দেখা গেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেও। সংস্থাটিতে কী পরিমাণ করোনা বিষয়ক পণ্য মজুত আছে তার বিস্তারিত তথ্য না পাওয়া গেলেও ভাণ্ডার বিভাগে করোনা মোকাবিলার পর্যাপ্ত সামগ্রী নেই বলে জানা গেছে। এছাড়া করোনা মোকাবিলায় নাগরিকদের জন্য নগরীর প্রায় ২৮টি স্থানে হাত ধোয়ার বেসিন স্থাপন করেছিল ডিএনসিসি। কিন্তু বর্তমানে এসব বেসিনের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। কোথাও কোথাও বেসিনের দেখা মিললেও সেগুলো সচল নয়। নেই পানি, সাবান বা জিবাণুনাশক। করোনাভাইরাসের জীবাণু ধ্বংসে প্রতিদিন পানির সঙ্গে জীবাণুনাশক ব্লিচিং পাউডার ও সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইড মিশিয়ে গাড়িতে করে নগরীর সড়ক, ফুটপাতসহ জনবহুল এলাকায় ছিটানো হতো। কিন্তু বর্তমানে সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইড রাসায়নিকটির মজুত না থাকার কারণে সেটিও ছিটানো বন্ধ রয়েছে।

করোনা সংক্রমণ রোধে গত ২৩ জুন নগরীর রাজাবাজার পরিদর্শনে এসে ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘ব্যবহৃত সংক্রামক বর্জ্য গৃহস্থালীর অন্য বর্জ্য থেকে অলাদা রাখতে হবে। ব্যবহৃত মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, পিপিইসহ সব সংক্রামক বর্জ্য গৃহস্থালীর অন্য বর্জ্যের সঙ্গে রাখলে পরবর্তী ৭ জুলাই থেকে ডিএনসিসির কর্মীরা বর্জ্য নেবেন না। কিন্তু দেখা গেছে, সিটি করপোরেশনও করোনা বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ করতে পারেনি।

দুই সিটির কর্মীরা জানান, করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুর দিকে করপোরেশনের পক্ষ থেকে তাদের কিছু মাস্ক, পিপিই ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেওয়া হলেও এখন তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভাণ্ডার বিভাগের কর্মকর্তারাও জানান, করোনার সংক্রমণ রোধে কোনও মালামাল এখন ক্রয় বা বিতরণ করা হচ্ছে না। ফলে করোনার ঝুঁকি নিয়েই কর্মীদেরকে মাঠে কাজ করতে হচ্ছে। অনেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সুরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ করে কাজ করছেন। অপেক্ষাকৃত কম বেতনের কর্মচারীরা তাও পারছেন না। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।

জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মামুনুর রহমান মামুন বলেন, ‘করোনা মোকাবিলায় আমাদের এখন শুধু অ্যাওয়ারনেস চলমান রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে আমাদের যেসব স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন, তারা ডেঙ্গুর পাশাপাশি করোনা বিষয়েও মানুষকে সচেতন করছেন। আর আগে যেভাবে জীবাণুনাশক ছিটানো হতো সেটা এখন সেভাবে করছি না। কারণ, এখন রাস্তাঘাটে বিপুল পরিমাণে যানবাহন বেড়ে গেছে। হাত ধোয়ার বেসিনও বন্ধ রয়েছে। এছাড়া এখনও যেসব কর্মীর পোশাক (সুরক্ষা সামগ্রী নয়) দরকার আমরা তাদেরকে দিচ্ছি। কর্মীদের গামবুটও দেওয়া হচ্ছে। আর বস্তি এলাকার মানুষের জন্য ইউএনডিপি কিছু সাবান, মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিচ্ছে। এছাড়া সরকার থেকে যেভাবে নির্দেশনা আসছে সেভাবে ত্রাণ বিতরণ হচ্ছে।’

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: