গরীবের কথা বাসী হলে ফলে: ড. রফিকুল ইসলাম

রিপোর্ট: মোজন মন্ডল

সম্প্রতি বর্জ্য অব্যবস্থাপনায় ধলেশ্বরী নদী দূষণ নিয়ে ট্যানারি শিল্প বন্ধ করে দেওয়ার সংসদীয় কমিটির সুপারিশের প্রতিক্রিয়ায় তিনি সিদ্ধান্তের প্রতি সহমত প্রকাশ করে এই কথা বলেন, সাভারের নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ও সাবেক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. রফিকুল ইসলাম। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হলেও দীর্ঘ দিন ধরে সাভারের পরিবেশ, নদী ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করে আসছেন। তিনি প্রতিনিয়তই ডিইপিজেডের দূষণ নিয়ে কৃষি জমির উর্বরতা শক্তি হারানোসহ বংশী নদীর পানি দূষণের বিষয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন।

তার মতে, পরিকল্পিত শিল্প নগরী গড়তে হলে রাজধানীর উপকণ্ঠ সাভারকে বেছে নেওয়ার কোন যৌক্তিকতাই নেই। উন্নত দেশ গুলোতে ভাটি অঞ্চলে শিল্পকারখানা বা বিসিক নগরী পরিকল্পিত উপায়ে তৈরি করার দৃষ্টান্ত রয়েছে। বংশী, তুরাগ ও ধলেশ্বরী এই তিনটি ঐতিহ্যবাহী নদী সাভারের প্রাণ। একসময়কার প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সাভারকেতো বটেই শিল্পকারখানার আধিক্যতার কারণে এখানকার তিনটি নদীসহ খালবিলও আজ বিলীন হওয়ার পথে। সেই তুলনায় সাভারবাসীর কোন উপকারই হচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। সম্প্রতি তার ব্যক্তিগত ফেসবুকে সাভারের ট্যানারি শিল্প নিয়ে একটি কলাম লিখেছেন হুবহু তুলে ধরা হলো–

“গরীবের কথা বাসি হলে ফলে”

সাভার, হরিণধরায় চামড়া শিল্প নগরী বন্ধের সুপারিশ করেছেন সংসদীয় কমিটি। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, যার সভাপতি এমপি সাবের হোসেন চৌধুরী।

বুড়িগঙ্গার দূষণ কমাতে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো সরিয়ে আনার উছিলায় সাভার তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের হরিণধরায় ব্যক্তিগত মালিকানার কৃষি জমি, ভূমি দস্যুদের দখল করা কিছু জমি, ধলেশ্বরী নদীর তীর দখল করা ২০%-২৫% জমি নানাভাবে একোয়ার করে নেয়া হয় ২০০৩ সালের প্রারম্ভে বিএনপি সরকারের আমলে। ঐ সময়ে মন্ত্রী ছিলেন কেরানীগঞ্জের আমানউল্লাহ আমান, যার বাড়ি হযরতপুর ইউনিয়ন, যাহা হরিণধরা সংলগ্ন। আর এক মন্ত্রী ছিলেন সামসুল ইসলাম যার বাড়ি সিংগাইর ধলেশ্বরী নদীর ওপারেই এবং হরিণধরা সংলগ্নেই। দুই মন্ত্রী যুক্তি করে এলাকার বিএনপি নেতা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জামাল সরকার এবং প্রাক্তন চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা লাবু চেয়ারম্যান (বর্তমানে অবশ্য ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ নেতা যাহা রাজনৈতিক ভাষায় হাইব্রিড)।

এরা এলাকার জমির দাম বৃদ্ধি, জমির বেঁচাকেনার সুবিধা, জমি দখল, জমির সংলগ্ন নদীর তীর দখল এবং এ সমস্ত দখলি জমির ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে বিল তুলে নেয়া ইত্যাদি বাণিজ্য করার স্বার্থেই ক্ষমতার ছায়ায় থেকে বুড়িগঙ্গার উজানে সব্জি-চাষের সবুজ বলয়ে গরিব ও মধ্যবিত্ত নিরেট চাষীদের এলাকায় চাষীদের নানা লোভ-লালসা দেখিয়েই জমি হুকুম দখল, কেনা, দখল করা ইত্যাদি প্রক্রিয়া শুরু করে।

তখন থেকেই স্থানীয় সচেতন মানুষ হিসেবে আমরা সাধ্যমত এর প্রতিবাদ করেছি। নেতাদের নানা প্ররোচনা ও প্রলোভন মোকাবেলা করে আমরা ততটা জনসমর্থন পাই নাই। ট্যানারী হলে জমির দাম বাড়বে, অনেকে চাকরী পাবে, ঘর ভাড়া বাড়বে, ছোট খাটো বাড়ি বানালেই ঘর ভাড়া হয়ে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি প্ররোচনায় আমরা এগুতে পারি নাই। উজানে ট্যানারী স্থাপনের প্রতিবাদ করেছি। একাধিকবার মানববন্ধন করেও জমাতে পারি নাই। জাতীয় পর্যায়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোও হরিণধরায় ট্যানারী স্থাপনের প্রতিবাদ করেছে।

পরবর্তীতে সাভারের পরিবেশবাদীরা সংগঠিত হয়ে ২০০৯ সনে আওয়ামীলীগ আমলে সাভারের সামগ্রীক পরিবেশ সুরক্ষাকল্পে “নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ, সাভার” নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলি। আমরা ঐ সময়েই বুড়িগঙ্গা নদীর উজানে লাল তালিকাভূক্ত ট্যানারী চালু করার প্রতিবাদ করে তৎকালীন সাভারের এমপি মুরাদ জং, ধামরাইয়ের এমপি বেনজির আহমেদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক অধ্যাপককে নিয়ে সেমিনার করেছি। তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের সাথে দেখা করে স্মারকলিপি পেশ, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছি। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি এমপি মুক্তাদির চৌধুরীকে এনে সেমিনার করেছি। পরিবেশবাদী সংগঠন বেলা’র আয়োজিত সেমিনারে হাজির হয়ে তৎকালীন পরিবেশ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সাথে বিতর্ক করেছি। তৎকালীন শিল্প মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর সাথেও কথা বলেছি, বিতর্ক করেছি।

সর্বক্ষেত্রেই আমাদের দাবী ছিল বুড়িগঙ্গার উজানে কৃষি জমি নষ্ট না করে, ধলেশ্বরীর তীর দখল না করে, লোকালযে, সর্বোপরি লাল তালিকাভূক্ত এলাকায় এধরণের শিল্পকারখানা না করে ভাটি অঞ্চলে দাউদকান্দির ডাউনে ট্যানারী স্থানান্তর করা হউক। কোয়ার করা জমিতে বিকল্প হিসেবে ঢাকা জেলার হেডকোয়াটার স্থাপন করা যেতে পারে, একটা উন্নত পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয় করা যেতে পারে। যা হবে পরিবেশ বান্ধব। কিন্তু কোন নেতারাই আমাদের কথায় কর্ণপাত করেন নাই। তারা সর্বসময়েই যুক্তি দেখিয়েছেন ট্যানারী ব্যবস্থাপনায় সর্বাধুনিক কেন্দ্রীয় ইটিপি স্থাপন করা হবে। সেখানে কর্মপরিচালনার সময়ে নদীতে পরা তরল বর্জ্যে কোন ক্ষতিকর উপাদান থাকবে না। এক মাননীয় মন্ত্রী তো বললেন ডালিমের রসের মত বিশুদ্ধ পানি ধলেশ্বরী নদীতে নির্গত হবে। আপনারা তা পানও করতে পারবেন। আমরা বারবার বলেছি, এধরণের অতি আধুনিক প্রযুক্তির সিইটিপি আমাদের দেশে চালু করা সময় সাপেক্ষ। তা ছাড়া ট্যানারী শিল্পে তরল বর্জ্য ছাড়াও কঠিন বর্জ্য ও বিপুল মাত্রায় গ্যাস জাতীয় বর্জ্যও বিদ্যমান। সে ব্যাপারে কোন বাস্তব ব্যবস্থা না করেই কর্তৃপক্ষ সাভারে পরিপূর্ণভাবে ট্যানারী স্থানান্তর করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

সর্বশেষ ‘বেলার’ নেতৃত্বে কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের যৌথ উদ্যোগে সাভার গলফ ক্লাবে ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি এমপি সাবের হোসেন চৌধুরীকে প্রধান অতিথি করে এক বড় আকারের সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এমপি সাবের হোসেন গলফ ক্লাবে আসার পথে সাভার বলিয়ারপুরে ডিসিসির স্থাপিত ডাম্পিং স্টেশন পরিদর্শন করেন, হরিণধরায় ট্যানারী পরিদর্শণ করেন, সেখানেও আমরা ডাম্পিং স্টেশন ও ট্যানারীতে দূষণের ব্যাপারে সোচ্চার হই। পরবর্তিতে মূল সেমিনার পর্বেও পরিবেশবাদী সংগঠন ছাড়াও অনেক গণ-সংগঠন ট্যানারীর ব্যাপারে অনেক বিরোপ বক্তব্য পেশ করেন। ঐ সেমিনারেও প্রধান অতিথি এমপি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছিলেন ইটিপি পূর্ণাঙ্গরূপে চালু না হওয়ার আগেই হরিণধরায় ট্যানারী স্থানান্তর করা ঠিক হবে না। আজকে দুই বছর পর ২০২১ সালের আগস্ট মাসে সংসদীয় কমিটি চামড়া শিল্পনগর বন্ধের সু-পা-রি-শ করেছেন। সামান্য একটু কানে পানি এসেছে। ধলেশ্বরী নদীর পানি ধ্বংস এবং এলাকার পরিবেশের বারোটা।

আমরা এখনও বলবো “হরিণধরায় স্থাপিত সিইটিপি আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত হয় নাই। আর তা ছাড়াও এখানে কঠিন বর্জ্য, গ্যাসীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জীবনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ক্রোমিয়াম ব্যবস্থাপনা মোটেই হচ্ছে না। অচিরেই এই ট্যানারী শিল্প আরও ভাটি এলাকায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্থানান্তর করার প্রয়োজন হয়ে পরবে।”
এটাই আমাদের ভবিষ্যৎ বাণী।

 

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!