গ্যাস বিস্ফোরণের শঙ্কা : সাভার হতে পারে আরেক না’গঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার সাভার উপজেলার সর্বত্রই যেন জালের মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। নিম্নমানের ফিটিংস ব্যবহার করায় এসব সংযোগের লিকেজ থেকে অহরহই ঘটছে দূর্ঘটনা। হঠাৎ শক্তিশালী বিস্ফোরণে অধিকাংশ দূর্ঘটনায় ভেঙ্গে পড়ছে কনক্রীটের দেয়াল। এতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ও ভবনের নিচে চাপা পগে প্রাণপ্রদীপ নিভে যাচ্ছে পুরো পরিবারের। গত দুই বছরে কেবল সাভারের আশুলিয়ায় এমন অনাকাঙ্খিত দূর্ঘটনায় মারা গেছেন দুটি পরিবারের শিশু ও নারীসহ নয় জন। এছাড়া আলাদা বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন আরো দুই জন, অগ্নিদগ্ধসহ আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন।

গত শুক্রবার রাতে নারায়নগঞ্জে একটি মসজিদে ভয়াবহ এসি বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনায় চরম আতঙ্কে রয়েছেন আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দারা। সারাদেশ যখন বিভীষিকাময় এই মৃত্যুশোকে স্তব্ধ, তখন এ দূর্ঘটনার বিভৎসতায় শোকের সাথে নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন এই জনপদের বাসিন্দারা। তাদের মতে, সাভারে তিতাস গ্যাসের আবাসিক বৈধ গ্রাহকের চেয়ে অবৈধ’র সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। যার কারণে ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলে যত্রতত্র মাটির নিচে জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে অবৈধ সংযোগের পাইপ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের ৫ জুলাই ভোরে আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকার দূর্গাপুরে শহীদ হাজীর বাড়িতে আবার চোরাই গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ হয়। এতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে একই পরিবারের শিশু আল-আমীন, তার গার্মেন্ট শ্রমিক বাবা কাশেম ও মা ফাতেমা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এঘটনায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ প্রদানকে দূর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে স্থানীয় যুবলীগ নেতাসহ ৭জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করে পুলিশ।

একই বছরের ৯ জুন ভোরে কাঠগড়া উত্তরপাড়া এলাকার ইমন মিয়ার বাড়িতে রান্নাঘরে বিস্ফোরণে দগ্ধ হয় শিশুসহ ৭ জন। তবে তারা বেঁচে যান।

এর আগে, ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর ভোরে আশুলিয়ার মানিকগঞ্জ পাড়া এলাকায় আবদুল হামিদের বাড়িতে ভাড়াটিয়ার একটি কক্ষে রান্নার জন্য চুলা জ্বালাতেই বিকট আওয়াজে বিস্ফোরণ ঘটে। এসময় আগুনে ঝলসে মারা যায় শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ একই পরিবারের ৬ জন। দূর্ঘটনার কারণ হিসেবে অবৈধ গ্যাস লাইনের পাইপে লিকেজ থেকে রান্নাঘরে জমে থাকা গ্যাস আগুনের সংস্পর্শে এসে বিস্ফোরণ ঘটে বলে জানা যায়।

এছাড়া ২০১৯ সালের ৩ জুলাই আশুলিয়ার কাঠগড়া উত্তরপাড়া দুকাঠি এলাকায় একইভাবে চোরাই গ্যাসের লাইন থেকে বিস্ফোরণে শিশুসহ দুই জন মারা যায়।

অনুসন্ধানে সাভার পৌর এলাকাসহ পুরো উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অবৈধ ভাবে গ্যাস সংযোগ থাকার বিষয়টি জানা যায়। পৌর সভার গেন্ডা, রাজাশন, সিটিলেন, উলাইল, কর্ণপাড়া, হেমায়েতপুর ও আশুলিয়ার কবিরপুর, বারৈপাড়া, জিরানী, শ্রীপুর, বাইপাইল, বুড়িরবাজার, ডেন্ডাবর, পল্লীবিদ্যুৎ, শ্রীখন্ডিয়া, গাজীরচট, জামগড়া, বেরন, নিশ্চিন্তপুর, ঘোষবাগ, নরসিংহপুর, জিরাব, ইয়ারপুর, টঙ্গাবাড়ি, দূর্গাপুর ও কাঠগড়াসহ আশুলিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বাসা বাড়িতে অবৈধ সংযোগের প্রমাণ মিলেছে।

সাভার আঞ্চলিক তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানীর ব্যবস্থাপক (বিপণন) আবু সাদাত মো. সায়েম বলেন, সাভারে প্রায় ৫২ হাজার বৈধ আবাসিক ও ১ হাজার ৫০০ শিল্প সংযোগের বিপরীতে অবৈধ গ্যাস সংযোগের সংখ্যা রয়েছে। তবে কি অবৈধ গ্যাস সংযোগের সঠিক পরিসংখ্যান তার কাছে নেই। তবে গত দুই বছরে ৭০টি অভিযানে ১ লাখ ৩১ হাজার ৯৮০টি অবৈধ সংযোগ তারা বিচ্ছিন্ন করেছেন। উচ্ছেদ করেছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮০ ফুট পাইপ। এসব অভিযানে এ পর্যন্ত ১২ টি মামলা ও ৮ লক্ষাধিক টাকা অর্থদন্ড করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও কোন ভাবেই এই অঞ্চলে অবৈধ গ্যাস সংযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, এসব অবৈধ সংযোগে নিম্নমানের ফিটিংস ব্যবহার করার ফলে মাঝে মধ্যেই দূর্ঘটনায় হতাহতের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে। তাই জীবন বাঁচাতে ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ গ্যাসের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সাধারণ মানুষ, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার তাগিদ দেন এই কর্মকর্তা।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: