চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য আমরা কতটুকু প্রস্তুত?

আব্দুল্লাহ তাহের

স্বনামধন্য কৌশল প্রণেতা টম গুডউইন ২০১৫ সালে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে সহজে বোঝানোর জন্য চমৎকার এক বাক্যগুচ্ছ ব্যবহার করেন। ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্যাক্সি কোম্পানি উবারের নিজের কোনো ট্যাক্সি নেই, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিডিয়া ফেসবুক নিজে কোনো কনটেন্ট তৈরি করে না, পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাইকার আলিবাবার কোনো গুদাম নেই এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রোভাইডার এয়ারবিএনবির নিজেদের কোনো রিয়েল এস্টেট নেই।’

২০১৬ সাল থেকে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের কর্তাব্যক্তি ক্লাউস শোয়াইব প্রথম এই বিপ্লবের কথা বলতে শুরু করেন। প্রথম শিল্পবিপ্লব হলো বাষ্পীয় ইঞ্জিন। পানি আর বাষ্পের ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি। দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব হলো বিদ্যুৎ ব্যবহার করে গণ-উৎপাদন। ইলেকট্রনিকস আর তথ্যপ্রযুক্তিকে কেন্দ করে গেল শতকের মাঝামাঝি সময়ে ট্রানজিস্টর আবিষ্কারের পর শুরু তৃতীয় শিল্পবিপ্লব। আর এই তৃতীয় বিপ্লবের ওপর ভর করেই এখন নতুন এই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়েছে। এটি হচ্ছে প্রযুক্তির একধরনের মিথস্ক্রিয়া, যার ফলে ভৌত জগৎ, ডিজিটাল জগৎ আর জীবজগতের মধ্যে পার্থক্যটা হয়ে যাচ্ছে বায়বীয়।

কয়েকশ’ কোটি লোকের মুঠোফোনের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকা, অকল্পনীয় প্রসেসিং আর স্টোরেজ ক্ষমতা এবং সহজে জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশাধিকারের ফলে সভ্যতা যে কোথায় যাবে, তা চিন্তা করাও কঠিন বটে। নিত্যনতুন প্রযুক্তির আবির্ভাবে সবকিছুতে একটা গোলমাল লেগে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস, ইন্টারনেট অব থিংস, নিজে চলা গাড়ি, ত্রিমাত্রিক প্রিন্টিং, ন্যানো টেকনোলজি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, শক্তি সঞ্চয় কিংবা কোয়ান্টাম কম্পিউটিং। আর ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিমেষে হাজার হাজার লোকের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে। পাঁচ কোটি লোকের কাছে রেডিওর পৌঁছাতে লেগেছে ৩৮ বছর, টেলিভিশনের ১৩ বছর অথচ ইন্টারনেটের লেগেছে ৪ বছর। ফেসবুকের? ২৪ মাস!

কেমন জনগোষ্ঠী দরকার? এই পরিবর্তন আর উন্মাদনার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হলে এমন জনগোষ্ঠী দরকার, যারা এর উপযোগী, যাদের রয়েছে বিপ্লব মোকাবিলার শক্তি, রয়েছে সেটিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের উন্নতি করার উপায়। কর্মবাজারের কথাই ধরা যায়। পিডব্লিউসি নামের চিন্তক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, স্বয়ংক্রিয়করণ ও রোবটিকসের পাল্লায় ২০৩০ সালে বিশ্বের ৮০ কোটি বর্তমান চাকরিই নাই হয়ে যাবে। এই ঝড় মূলত বয়ে যাবে শ্রমনির্ভর কাজের বেলায় এবং স্বভাবতই আমাদের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলো বিপদে পড়বে। অন্যদিকে নতুন ১০০ কোটি কর্মসৃজন হবে, তবে সেগুলো কেমন, তার বেশিরভাগই আমরা কল্পনা করতে পারছি না। মাত্র এক দশক আগেও কেউ ভাবতে পারেনি, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে লোককে ‘ফেসবুকে নজর রাখা’র জন্য চাকরি দেয়া হবে!

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি শত সম্ভাবনার দ্বারো উন্মোচন করছে। এ সময় দক্ষ নেতৃত্ব ও গুণগত শিক্ষার ওপর জোর দেয়া আবশ্যক। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো জরুরি। শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে আমাদের। শিক্ষার বহুমাত্রিকতা আগামীর নেতৃত্ব গঠনে ভূমিকা রাখবে। আমাদের শিক্ষার্থীদের বানানো স্যাটেলাইট ‘ব্র্যাক অন্বেষা’ এখন মহাকাশে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমাদের শিক্ষার্থীরা টেক্কা দিচ্ছে নামিদামি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণা, সরকার ও শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বয় থাকাটা জরুরি। আমাদের যে করেই হোক গবেষণায় আরো অর্থ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের তরুণদের চিন্তা করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পড়াশোনায় বৈচিত্র্য বাড়ানো দরকার। আমাদের যেমন গণিত নিয়ে পড়তে হবে, তেমনি পড়তে হবে শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে। প্রোগ্রামিংসহ বিভিন্ন প্রাথমিক দক্ষতা সবার মধ্যে থাকা এখন ভীষণ জরুরি।

যা করতে হবে এখনি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব নিয়ে দেশে প্রচুর সেমিনার আর গোলটেবিল বৈঠক হচ্ছে। সবারই একই মত, এই বিপ্লব মোকাবিলায় অনেক কাজ করতে হবে। এআই, আইওটি, বিগ ডেটা, ব্যাকচেইনের মতো জনপ্রিয় শব্দ নিয়ে কথা বলা হচ্ছে সেখানে কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেই। আর কেবল পরিকল্পনা করলেই তো হবে না, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের মানব সম্পদকেও যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে হবে এই পরিবর্তনের জন্য। তবে আশার কথা, সম্প্রতি ‘ন্যাশনাল আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স স্ট্র্যাটেজি’ নিয়ে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।

একই ধরনের পরিবর্তন হতে হবে উচ্চশিক্ষার স্তরে। শিক্ষার্থীদের প্রচলিত প্রশ্নোত্তর থেকে বের করে এনে তাদের কেস স্টাডি, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রজেক্ট ইত্যাদির মাধ্যমে মূল বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রকাশযোগ্যতা, দলীয় কাজে দক্ষতা তৈরির জন্য ওই সব কেস স্টাডি, অ্যাসাইনমেন্ট কিংবা প্রজেক্টের উপস্থাপনাকে করতে হবে বাধ্যতামূলক এবং সেটি শুধু নিজ নিজ শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না, ছড়িয়ে দিতে হবে নানা অঙ্গনে। উচ্চশিক্ষার সব স্তরে শিল্পের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংযোগ বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষানবিসি কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের কার্যক্রম সম্পর্ক হাতেকলমে শিখতে পারে। এ তো গেল শিক্ষা কার্যক্রমের পদ্ধতি।

ঢেলে সাজাতে হবে বিষয়ভিত্তিক উচ্চশিক্ষাকেও। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে প্রযুক্তিভিত্তিক বিষয়াবলিতে আসনসংখ্যা বাড়াতে হবে। গত অক্টোবর মাসে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, আইসিটিভিত্তিক স্নাতকদের চাকরি পাওয়ার হার অন্যান্য বিষয়ের স্নাতকদের দ্বিগুণ! কাজেই দেয়ালের লিখন পড়তে পারতে হবে। একই সঙ্গে পলিটেকনিক ও ভোকেশনাল শিক্ষা কার্যক্রমকে জোরদার করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে এই শিক্ষা সম্পর্কে সাধারণে বিরূপ ধারণা রয়েছে। কারিগরি শিক্ষার্থীদের অনেক দিন ধরে বৃত্তি দেয়া হয় বলে অনেকেই মনে করেন, এই শিক্ষা কেবল পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য। ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণি কখনোই তাদের সন্তানদের কারিগরি শিক্ষায় পাঠাতে চায় না। এই চিত্রও আমাদের বদলাতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে মোকাবিলা করে এটিকে আশঙ্কার পরিবর্তে সম্ভাবনায় পরিণত করতে হলে আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার খোলনলচে পাল্টে ফেলতে হবে। তবে, সেটি গুটিকয় লোকের একটি সভার মাধ্যমে না করে একটি সমন্বিত নীতি গ্রহণের মাধ্যমে করা প্রয়োজন। নতুবা ২০৩০ সালে আমরা এমন সব গ্র্যাজুয়েট তৈরি করব, সমাজে যাদের কোনো চাহিদাই থাকবে না।

শিক্ষার পাশাপাশি দেশে আইনি সংস্কারও জরুরি। এ দেশের প্রাচীন আইন এখনো লিখে রেখেছে রীতিমতো চুক্তি করে ‘বর্গফুটের’ অফিস না নিলে ব্যবসা করা যাবে না অথচ জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে অনলাইনে ব্যবসা নিবন্ধন আর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে ঘরে বসেই ইন্টারনেট-সংযোগ দিয়ে তৈরি করা যায় বৈশ্বিক ব্যবসা কিন্তু আমাদের আইনপ্রণেতাদের এসব যুগোপযোগী আইন নিয়ে ভাববার সময় কোথায়? সময়ের কাজ করতে হবে সময়েই। তথাকথিত টেকনিক্যাল বা আইটি প্রশিক্ষণের নামে জনগণের অর্থের অপচয় রোধ করে আমাদের এখনি সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নে নেমে পড়তে হবে। তা করতে না পারলে আমাদের তরুণেরা বেকারত্বের করাল গ্রাসে পড়ে যাবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের সুফলের বদলে আমরা কুফল বয়ে আনব। জাতি নীতি-নির্ধারকদের কাছে তা প্রত্যাশা করে না।

লেখক: আব্দুল্লাহ তাহের – চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ গণশক্তি আন্দোলন-বিপিএম।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: