তাজরীন অগ্নিকাণ্ড: ৮ জনের সাক্ষ্যগ্রহণে বিচার থেমে আছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়া এলাকায় তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক হতাহতের সাত পরও বিচারে কার্যত অগ্রগতি নেই।

২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর অগ্নিকাণ্ডে ১১৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়৷ আহত হয় তিন শতাধিক পোশাক শ্রমিক। ঘটনার পরের দিন আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) খায়রুল ইসলাম অজ্ঞাত পরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই মামলায় নাশকতার পাশাপাশি অবহেলাজনিত মৃত্যুর দণ্ডবিধির ৩০৪ (ক) ধারা যুক্ত করা হয়।

এরপর ২২ ডিসেম্বর ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক এ কে এম মহসিনুজ্জামান খান তাজরীন ফ্যাশনসের চেয়ারম্যান ও এমডিসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, কারখানা ভবনটি ইমারত নির্মাণ আইন মেনে করা হয়নি। শ্রমিকদের বের হওয়ার জন্য ভবনে জরুরি বহির্গমন পথ ছিল না। তিনটি সিঁড়ির মধ্যে দুটি নিচ তলার গুদামের ভেতরে এসে শেষ হয়েছে। ওই গুদামে আগুন লাগার পর শ্রমিকেরা বের হতে চাইলে কারাখানার ম্যানেজার বাধা দিয়ে বলেন- আগুন লাগেনি। অগ্নিনির্বাপণের মহড়া চলছে। তিনি বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেন। ফলে শ্রমিকেরা নিচে নামতে পারেনি।

মালিকের অবহেলাজনিত হত্যা ও নরহত্যার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে উল্লেখ করে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩২৫, ৪৩৬, ৩০৪, ৩০৪-ক ও ৪২৭ ধারায় অভিযোগপত্র দেয়া হয়। ১৩ জন আসামির মধ্যে পাঁচজন পলাতক ও আটজন জামিনে রয়েছেন।

আসামিরা হলেন, প্রতিষ্ঠানের মালিক দেলোয়ার হোসেন, চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তার, লোডার শামীম, স্টোর ইনচার্জ (সুতা) আল আমিন, সিকিউরিটি ইনচার্জ আনিসুর রহমান, সিকিউরিটি সুপার ভাইজার আল আমিন, স্টোর ইনচার্জ হামিদুল ইসলাম লাভলু, অ্যাডমিন অফিসার দুলাল উদ্দিন, প্রকৌশলী এম মাহবুবুল মোর্শেদ, সিকিউরিটি গার্ড রানা ওরফে আনোয়ারুল, ফ্যাক্টরি ম্যানেজার আব্দুর রাজ্জাক, প্রোডাকশন ম্যানেজার মোবারক হোসেন মঞ্জুর ও কোয়ালিটি ম্যানেজার শহীদুজ্জামান দুলাল।

এদের মধ্যে মো. শহিদুজ্জামান দুলাল, মোবারক হোসেন মঞ্জু, মো. রানা ওরফে আনারুল, মো. শামীম মিয়া ও আল আমিন পলাতক।

অভিযোগপত্রে ১০৪ জনকে সাক্ষী করা হয়। এখন পর্যন্ত আটজনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। বাকি এখনো ৯৬ জন। আদালত সাক্ষীদের প্রতি অজামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।

২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ এস এম কুদ্দুস জামান এ মামলার চার্জ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন এবং পরবর্তী বিচারের জন্য অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতে স্থানান্তর করেন। সর্বশেষ গত ৭ মার্চ আবিদ হোসেন নামে এক সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। এরপর ছয়টি ধার্য তারিখ পার হলেও কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। সর্বশেষ গত ৭ নভেম্বর মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য ছিল। আদালত আগামী ৩০ জানুয়ারি পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য করেছেন।

মামলাটি বর্তমানে ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রদীপ কুমার রায়ের আদালতে বিচারাধীন।

সংশ্লিষ্ট আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর রেহানা আক্তার বলেন, অধিকাংশ সাক্ষী তাজরীন ফ্যাশনসের কর্মচারী। আর তারা ছিলেন ওই এলাকার ভাড়াটিয়া। তদন্ত কর্মকর্তা যখন তদন্ত করেছেন, তখন তিনি সাক্ষীদের বর্তমান ঠিকানা লিপিবদ্ধ করেছেন। স্থায়ী ঠিকানা নেননি। যে কারণে বর্তমান ঠিকানায় অর্থাৎ সাভারের ঠিকানায় সমন পাঠানো হয়। এখানে পুলিশের গাফিলতি আছে। থানায় সমন পাঠানো হলে থানা থেকে জারি হয় না। বছরের পর বছর পড়ে থাকে।

তিনি বলেন, ‘‘সাক্ষ্যগ্রহণের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের গাফিলতি নেই। যে সকল সাক্ষীর স্থায়ী ঠিকানা রয়েছে, তাদের পর্যায়ক্রমে আমরা সাক্ষ্য দিতে আদালতে নিয়ে আসব। চেষ্টা করবো যত দ্রুত সম্ভব মামলার বিচার যেন শেষ হয়।’’

আসামিপক্ষের আইনজীবী হেলেনা পারভীন বলেন, ‘‘প্রতি ধার্য তারিখে আসামিরা আদালতে আসেন কিন্তু সাক্ষীরা আসেন না। আমরা সবাই সুষ্ঠু বিচার চাই; কেউ যেন অযথা হয়রানির শিকার না হয়।’’

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের সভাপতি মাহাতাব উদ্দিন সহিদ বলেন, ‘‘আমরা চাই মামলার বিচার হোক। দৃষ্টান্ত হোক যে অপরাধ করলে সাজা পেতে হয়।’’

অবিলম্বে নিহত শ্রমিকের পরিবার ও আহত শ্রমিকদের পুনর্বাসনসহ সব পোশাক কারখানায় নিরাপদ কর্মস্থল নিশ্চিতের দাবি জানান তিনি।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
%d bloggers like this: