ধামরাইয়ে ‘ভুল চিকিৎসায়’ প্রাণ গেল প্রসূতির, ধামাচাপা চেষ্টা

ধামরাই প্রতিনিধি

ঢাকার ধামরাইয়ে সিজারিয়ান অপারেশনে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নাছরিন আক্তার নামে এক প্রসূতি মায়ের মৃত্যু হয়েছে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, ‘ভুল চিকিৎসায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তবে সুস্থ আছে নবজাতকটি।’ ঘটনার পরপরই গা ঢাকা দিয়েছেন অপারেশনে অংশ নেয়া চিকিৎসকরা। শুধু তাই নয়, অসহায় দরিদ্র পরিবারটিকে অর্থের লোভ দেখিয়ে ও ভুল বুঝিয়ে থানায় অভিযোগ না করতে কৌশল অবলম্বন করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবী, ‘অপারেশনের পর স্ট্রোকে রোগীর মৃত্যু হয়েছে।’ তবে এর যথাযথ প্রমাণ দিতে না পেরে অবশেষে প্রতিবেদককে ম্যানেজেরও চেষ্টা করেন হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী।

ধামরাই উপজেলার ৯নং ওয়ার্ডের সেফ লাইফ হাসপাতালে গত পরশুদিন রাতে রোগীর মৃত্যু হলেও বিষয়টি জানাজানি হয় গতকাল রাতে। ততক্ষণে নিজ বাড়ি বাঙ্গালপাড়া গ্রামে দাফন করা হয় নাছরিন আক্তার নামে গৃহবধূর মরদেহ।

নিহত নাছরিন ধামরাইয়ের ভাড়ারিয়া ইউনিয়নের বাঙ্গালপাড়া গ্রামের মৃত আলী হোসেন বেপারীর মেয়ে। আড়াই বছর বয়সী এক সন্তানের জননী নাছরিনের স্বামী পাশের গ্রামের শাকিল হোসেন।

নিহতের বড় বোন শাহানা বেগম বলেন, আমার বোনের বাচ্চা ডেলিভারির ডেট ছিল ১২ তারিখ। এজন্যে আমরা ২ তারিখ আমরা এই হাসপাতালে আসি আল্ট্রা করানোর জন্যে। তখন ওটি বয় বাবুল ও’কে আল্ট্রা রুমে নিল। পরীক্ষার পর জানালো বাচ্চা আর মা ভালো আছে। আমরা ভাবলাম প্রথম বাচ্চা যেহেতু নরমালি হয়েছে, এটায়ও আমরা সময় নিবো। পরে আরও চেকাপ করে ওরা বলল, জরায়ুর মুখ এক ইঞ্চি পরিমাণ খুলছে। তখন আমাকে ওরা বলল, ‘শাহানা আপা এখন সময় নিলে আমরা রিস্ক নিব না, আপনি নিবেন।’ সময় নিলে হয়তো গাছ বাঁচলে ফল বাঁচবো, ফল বাঁচলে গাছ বাঁচবো না। এই কথা শুনে আমি বোনের স্বাসুরিকে কল দেই। ততক্ষণে দেখি আমার বোনকে ওটিত নিয়ে গেছে। ভর্তি করলো না, সিগনেচার নিলো না, আল্ট্রা রিপোর্টও দেখালো না।

তিনি বলেন, আমি এই হাসপাতালে চাকরি করেছি। একটা রোগীরে সিজার করবার গেলে আগে সিগনেচার নিতে হয়। পরে ওটিতে নেয়। যাহোক অনেক রাতে প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা পর যখন আমার বোনকে ওটি থেকে বের করবে তখন আমার কাছ থেকে ৩টা সাইন নেয়। ওই সময় ওটিতে ছিল সার্জেন প্রিয়াঙ্কা ও সজিব। আরেকজন সার্জেন ছিলো তার নাম জানি না। অপারেশনের সময় ওটিতে গেছিলাম আমারে হাসপাতালের মালিক ইমনে (হাসপাতাল মালিক) থাকতে দিলো না। এত লোকের অপারেশনের সময় ওটিতে আমি থাকলাম। কিন্তু কালকে ওই ইমনে আমাকে থাকতে দিলো না। কত যে রক্ত পড়ছে তা বলার মতো না। প্রচুর রক্ত পড়ছে ভাই। ফ্লোর, কাপড়চোপড় বোঝাই, একটা বোল, যন্ত্রপাতি বোঝাই আছিলো রক্তে।’

আপনার বোনের মৃত্যুর কারণ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কি বলেছে এমন প্রশ্নে বলেন, ‘তারা বলে ‘আপনার রোগী স্টোক করছে।’ আমি যেভাবে রক্ত দেখছি তাতে মনে হইছে, হয়ত জরায়ুর ওহানে রগ আছে না যে কোন একটা কাইটা ফালাইছে। অগো তাতেই আমাদের রোগী মারা গেছে। পরে তারাতারি রাতে ওরা লাশ দিয়ে দেয়। পরদিন ১১টার সময় আমার বাপের বাড়িতে তাকে দাফন করছি।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টাকা দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টার বিষয়টি প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে চাপে পড়ে এই অনৈতিক কাজ করেছেন বলে স্বীকার করেন তিনি। অসহায় ও দরিদ্রতার কারণে ঘটনার আকস্মিকতায় এমনটা হয়েছে বলেও দাবী তার।

তিনি বলেন, ‘এতো রাতে আমরা গ্রামের দুই তিনজন মানুষ বুঝে উঠিনি। আবার যদি পোস্ট মর্টেম করে লাশ কাটাছেরা করে! সে জন্যে অভিযোগ করিনি। পরে আমি আত্মীয়-স্বজনসহ হাসপাতালে যাই। হাসপাতালের মালিক ইমন আমাদের ১ লাখ টাকা দিতে চায় মিমাংসার জন্য। আমরা নেই নাই। গতকাল সন্ধ্যার পর ওরা জানায়, আজকে দেড় লাখ টাকা দিবে।’

এ বিষয়ে হাসপাতালের স্বত্তাধিকারী মালেকা বেগমের সাথে যোগাযোগ করা হলে নানান অপ্রাসঙ্গিক কথা বলতে থাকেন তিনি। এসময় তিনি দুঃখ প্রকাশ করে প্রতিবেদককে ম্যানেজের চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, ‘ডাক্তার অপারেশন করে চলে গেছে তখনতো রোগী সুস্থ। পরে স্ট্রোক করে মারা গেছে।’

তাহলে টাকা দিয়ে মিমাংসা কেন করতে চেয়েছেন এমন প্রশ্নে বলেন, ‘মিথ্যা কথা। আমরা কোন অফার দেই নাই। তাদের কোন অভিযোগ নাই।’

অপারেশনের আগে স্বজনদের স্বাক্ষর, ইসিজি ও আলট্রাসনো রিপোর্ট দেখান নাই কেন এমন প্রশ্নে বলেন, ‘যে মহিলাটা নিয়া আইছিলো সে আবার রোগীর বোন। সে আবার আমরা এখানে কাজ করতো। সবাইতো তারে চেনে তাই তারাতারি কইরা ভর্তি করছে। আর রোগীর বেশি সমস্যা ছিলো।’

এদিকে ঘটনার পরপরই গা ঢাকা দিয়েছেন অপারেশনে অংশ নেয়া চিকিৎসকরা। তাদের বিষয়ে জানতে চাইলে কথা ঘুরিয়ে নেন তিনি। এসময় চিকিৎসক যারা অপারেশন করেছেন তাদের নম্বর দিতে নানান অজুহাতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

পরে প্রতিবেদককে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে বলেন, ‘মানুষের কখন কোন বিপদ ঘটে বলা যায় না। যা হইয়া গেছে আমি আপনের কাছে ভাই সরি। ভাই, এটা নিয়ে আপনে কিছু কইরেন না। আমি আপনার বোইনের মতো। বোইনের এই আবদারটা রাইখেন আল্লায় ভালো করবো। আর এখন আপনে এইটা বইলায় বা কি করবেন কন? তার কি জীবনডা ফিরা আসবো?’

ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নুর ই রিফফাত আরা বলেন, ’লাইসেন্সের বিষয়টি তালিকা দেখে বলতে পারবো। তবে রোগী মারা যাওয়ার বিষয়টি আমি জানি না। রোগীর পরিবার বা কেউ যদি লিখিত অভিযোগ দেয়। আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবো।’

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!