নরেন্দ্র মোদির সফর: ঢাকা জোর দিচ্ছে কানেক্টিভিটিসহ ৬ ইস‌্যুতে

নিজেস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, মুজিববর্ষ এবং ভারতের সঙ্গে কূটনীতি সম্পর্কের ৫০ বছর একসঙ্গে পালন- তিনটি বিষয়কে সমন্বয় করে ঢাকা সফরে আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।  তার এই সফরে ঢাকার পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হচ্ছে কানেক্টিভিটিসহ ৬ ইস‌্যুতে এগুলো হলো, তিস্তাসহ অন্য ছয়টি নদীর পানি নিয়ে অমীমাংসিত বিষয়, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, রোহিঙ্গা, সুমদ্র অর্থনীতি, আমদানি-রপ্তানি বাধা দূর করা। এছাড়া, অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়ও  গুরুত্ব পাবে।

বিপরীতে দিল্লির পক্ষ থেকে আগ্রহ দেখানো হচ্ছে- পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে মাথায় রেখে গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে মতুয়া মহাসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ও মতুয়া ধর্মমতের প্রবক্তা হরিচাঁদ ঠাকুরের বাড়ি পরিদর্শন, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া পরিদর্শন, বরিশালের শিকারপুরে সুগন্ধা শক্তিপীঠ পরিদর্শন, কুষ্টিয়ার শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি পরিদর্শন, ট্রানজিট ইস্যু প্রভৃতি।  এসব বিষয় মোদির সফরে সম্ভাব্য বিষয়সূচি হিসেবে আলোচনার জন্য এরই মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটের মৌসুমে মোদি ঢাকা সফরকে রাজনৈতিকভাবেও ব্যবহার করতে চাইছেন।  ২৭ মার্চ থেকে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন শুরু হচ্ছে।  আট দফার ভোট শেষ হবে ২৯ এপ্রিল। এই সময়ে মোদির ঢাকা সফর এবং হরিচাঁদ ঠাকুরের বাড়িতে যেতে চাওয়া, রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি দেখতে চাওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের একটি অংশে বিপুলসংখ্যক মতুয়া সম্প্রদায়ের বসবাস।  উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়ার মতো জায়গায় মতুয়া ভোট একটি বড় ফ্যাক্টর। এই পরিস্থিতিতে মতুয়ার ধর্মমতের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুরের বাড়ি দেখতে চান মোদি।  সেখানে গেলে পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া সম্প্রদায়কে একটি বার্তা দিতে পারবেন তিনি।

নরেন্দ্র মোদির সফর চূড়ান্ত করতে একদিনের সফরে বৃহস্পতিবার (৪ মার্চ) ঢাকা আসছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর।  একদিনের সফরে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক বসবেন।  পানি, বাণিজ্য, সীমান্ত, কানেক্টিভিটিসহ অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে ড. মোমেনের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি।  নরেন্দ্র মোদির সফরের মধ্যদিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরালো করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে দুইপক্ষের আলোচনা হবে। এদিন চূড়ান্ত হবে ঢাকা সফরকালে মোদি কোথায় কোথায় যাবেন।  কারণ মোদির সফরে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সূচি চূড়ান্তের প্রতি জোর দিচ্ছে ঢাকা।  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন জয়শঙ্কর।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, মুজিববর্ষ এবং ভারতের সঙ্গে কূটনীতি সম্পর্কের ৫০ বছর এক সঙ্গে পালনের কথা ভারত বরাবরই বলে আসছে।  সেই ধারাবাহিকতায় ২৬ ও ২৭ মার্চ দুই দিনের ঢাকা সফরে আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আগামী ২৬ মার্চ ঢাকা–জলপাইগুড়ি রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল যৌথভাবে ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করবেন শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি। সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গোপালগঞ্জে টুঙ্গীপাড়া যাবেন মোদি। ২৭ মার্চ উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বাকি বিষয়গুলো বৃহস্পতিবার দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে চূড়ান্ত হবে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি নিয়ে এখনও অনেক বিষয় অমীমাংসিত রয়েছে।  মোদির সফরে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আলোচনা করতে চায় ঢাকা। তিস্তা, অন্য ছয়টি নদী, রহিমপুর খালসহ পানি নিয়ে অন্যান্য যে অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনায় স্থান পেতে পারে ঢাকার পক্ষ থেকে।  এছাড়া মনু, মুহুরি, দুধকুমার, ধরলা, গোমতি ও খোয়াই নদীর পানি বণ্টন নিয়ে একটি খসড়া চুক্তি নিয়ে কাজ চলছে এবং সেটি দ্রুত শেষ করতে চায় ঢাকা।  কুশিয়ারা নদীর পানি সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য রহিমপুর খাল খননে ভারত আপত্তি করছে। এ বিষয়টিও নিষ্পত্তির জন্য আলোচনা করবে ঢাকা।

আঞ্চলিক সহযোগিতা ও কোভিড পরবর্তী সময়ে সহযোগিতা নিয়েও মোদির সফরে আলোচনা হবে। এছাড়া ভারত থেকে আমাদের প্রচুর কাঁচামাল আসে। এই মালামালের জন্য আমদানি-রপ্তানি বাধা দূর করার বিষয়েও আলোচনা হবে। দুই দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানিও বাড়ছে। কিন্তু একইসঙ্গে পাটের ওপরে অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক, স্থলবন্দর সমস্যা, অশুল্ক বাধাসহ অন্যান্য অসুবিধার সম্মুখিন হচ্ছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। ভারতের আরোপিত অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহার এবং স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পাঠানো সংক্রান্ত জটিলতা দূর করার বিষয়ে আলোচনা চায় বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মোদির সফরের আগে আগামী ৭ ও ৮ মার্চ দুই দেশের বাণিজ্য সচিব পর্যায়েও এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।

কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ চুক্তির জন্য একটি যৌথ ফিজিবিলিটি স্টাডি করার জন্য এর আগে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে।  এটি দ্রুত শুরু করার জন্য তাগিদ দেবে ঢাকা। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড নিয়ে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দুই দেশের স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে আলোচনা হয়।  মেদির সফরে বিষয়টি আবারও তুলতে চায় ঢাকা।

ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিদেশীয় হাইওয়েতে সংযুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ। এ বিষয়ে ঢাকার প্রস্তাব নিয়েও দুইপক্ষ আলোচনা করবে।  এছাড়া নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে ভারতের মধ্য দিয়ে যোগাযোগের জন্য পাচঁটি নতুন রুটের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ, যা ভারতের বিবেচনাধীন আছে।  এর পাশাপাশি রোহিঙ্গা, সুমদ্র অর্থনীতিসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা আছে বলে জানা গেছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন রাইজিংবিডিকে বলেন, আমাদের সবচেয়ে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফর সব সময় আমাদের কাছে গুরুত্ব পায়।  বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করবো আমরা উভয় দেশই। যদিও তিনি (নরেন্দ্র মোদি) আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিববর্ষ উপলক্ষে আসছেন, তবুও আমাদের বন্ধুদেশ হিসেবে আমাদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে।

মন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য ইস্যু এবং কানেক্টিভিটির বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভুটানে যাওয়ার বিষয়ে আমরা অনুরোধ করেছি এবং ভারত বিষয়টি বিবেচনা করছে। আমরা কানেক্টিভিটি চেয়েছি।  বলেছি নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে কানেক্টিভিটি চাই।  বিবিআইএন করেছিলাম এবং ভুটানের জন্য আটকে ছিল।  এখন যতদূর হয়েছে ততদূর এটি চালু করবো। এছাড়া আমাদের পক্ষে থেকে একটি নতুন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড রোডে সংযুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ।  আশা করছি এসব বিষয় এই সফরে আলোচনায় আসবে।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: