পুলিশ কর্মকর্তার ‘মিথ্যা অপহরন মামলা’, তটস্থ এলাকা

সাভার প্রতিনিধি

সাবলিকা মেয়ে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়েছে দুই মাস। গোপনে আদালতে বিয়েও সেরে ফেলেছেন তারা। কিন্তু কোন কিছুই যেন মানতে নারাজ মেয়ের বাবাব ক্ষমতাধর পুলিশ কর্মকর্তা। দরিদ্র জামাই ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করেছেন মিথ্যা অপহরন মামলা। জামাইয়ের বৃদ্ধা মা ও প্রতিবেশী এক স্কুল শিক্ষকসহ তিনজনকে ওই মামলায় করা হয়েছে গ্রেফতার। রিমান্ডে এনে নির্যাতনেরও অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া পুলিশি গ্রেফতার আতঙ্কে ঘরছাড়া এলাকার অনেকেই।

অনুসন্ধানে আশুলিয়ার কাঁইচাবাড়ী এলাকায় পুলিশ কর্মকর্তার মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া আজহারুল ইসলামের বাড়িতে গেলে কাউকে পাওয়া যায়নি। আজহারুলের বৃদ্ধা মা হাজতে ও আরেক ভাই গ্রেফতার আতঙ্কে পলাতক থাকায় শুনসান নিরবতা সেখানে।

তবে মামলার নথি, বিবাহের কাগজপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রত্যক্ষদর্শী এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে পুলিশি হয়রানির সত্যতা মেলে।

জানা গেছে, গত ২২মে গাজীপুর বিজ্ঞ প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিয়ে করেন আজহারুল ইসলাম ও ফারজানা ইসলাম রৃদিতা। তবে এর দুই মাস পর আশুলিয়া থানায় মেয়ে অপহরনের মিথ্যা মামলা দায়ের করেন এক সময় একই থানায় কর্মরত উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফজিকুল ইসলাম। তবে বর্তমানে তিনি ময়মনসিংহে কর্মরত। মামলার বাদী এসআইয়ের স্ত্রী কাকলী আক্তার রিমা। আসামি করা হয় আটজনকে। এছাড়া মামলার নথিতে পুলিশ কর্মকর্তার মেয়ে ফারজানা ইসলামের বয়স উল্লেখ করা হয়েছে ১৬ বছর। অথচ জাতীয় পরিচয়পত্র ও শিক্ষা সনদে তার বয়স ১৯।

আতঙ্কিত এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কয়েক বছর আগে আশুলিয়া থানার এসআই ফজিকুল ইসলাম এই এলাকায় বাড়ি নির্মাণের পর পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন। সম্প্রতি ওই পুলিশ কর্মকর্তার মেয়ে ফারজানা ইসলাম হৃদিতা ও একই এলাকার মৃত আমজাদ হোসেনের ছেলে আজহারুল ইসলাম প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে গোপনে ঘর ছাড়ে। এর পরেই থানায় মেয়েকে অপহরনের মিথ্যা মামলা দায়ের করেন ওই এসআই। মামলার আসামি দরিদ্র আজহারুলের বৃদ্ধা মা’কে গ্রেফতার করে পুলিশ। একই মামলায় স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষককে গ্রেফতারের পর রিমান্ডেও আনা হয়। অথচ ওই পরিবারের সাথে মামলার অন্যান্যদের কোন যোগসূত্রতাও নেই বলে জানান তারা।

তারা আরও জানান, ঈদের আগের দিন রাতে হাবিবুর রহমান হাবিব নামে স্থানীয় এক ফার্মেসি ব্যবসায়ীকে ধরে নিয়ে যায় ডিবি পুলিশ। রাতভর ডিবি কার্যালয়ে আটকে রেখে ভোরে তাকে ছেড়ে দেয়। শুধু তাই নয়, পুলিশি আতঙ্কে তটস্থ এলাকাবাসী৷ পুলিশ যখন-তখন যাকেতাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

ঈদের আগের রাতে পুলিশি হয়রানির শিকার স্থানীয় আদর্শ ফার্মেসীর মালিক হাবিবুর রহমান হাবিব জানান, আমি একজন পল্লী চিকিৎসক। হঠাৎ করে সেদিন রাত ৯টার সময় আমাকে পুলিশ এসে উঠিয়ে নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে আমাকে ডিবি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাকে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে। আমি তাদেরকে বারবার একটা কথাই বলছি, এবিষয়ে আমি কোনো কিছুই জানি না। তারপরও তারা আমাকে অনেক হয়রানি করছে। যদিও তারা আমাকে কোনো টর্চার করে নাই। পরে ভোর রাত সাড়ে ৪টার দিকে পুলিশ আমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিবেশী এক নারী বলেন, ছেলে-মেয়ে ক্যামনে ভাইগা গেছে তা এলাকার কেউ জানেনা। কিন্তু পুলিশ আইসা রাস্তাঘাটে যারে পাইতেছে তারেই ধইরা নিয়া যাইতাছে। গরীব, নিরীহ মানুষ, তাগোও। এই ছেলের (আজহারুল) বাপ নাই। তার মা কত কষ্ট করে ছেলে দুইটারে মানুষ করতাছে। এই ছেলের মায়েরে জেলে নিয়া বহায় রাখছে, সাজা দিতাছে। এই বিচারটা আমি শেখ হাসিনার কাছে চাই। আমাদের এলাকায় প্রায় সব বাসার বউ-ঝিরা আতঙ্কে আছে। সবাই বাড়িতে তালা দিয়া পলায় রইছে এই পুলিশের ভয়ে।

ইয়াজ উদ্দিন নামে একজন প্রবীণ বলেন, এই ঘটনার পর থেকে আমিও আতঙ্কে পলায় আছি। আমার ভাইস্তা আইডিয়াল স্কুলের হেডমাস্টার নির্দোষ আরিফরেও ধইরা নিছে পুলিশে। এগো সাথে আমাগো কোনো সম্পর্ক নাই। আজাহার আর ওই মাইয়ার গোপনে সম্পর্ক। তারা গোপনে ভাইগা গেছে, আমরা কিছুই জানি না। অহন আমাগো পুলিশ ধইয়া ধইরা নেয়, এইডা কেমন কথা? এই বয়সেও অহন রাতে পুলিশের ভয়ে বাড়িতে থাকতে ভয় লাগে। যদি ধইরা নেয়? ঈদটাও গ্রামের মানুষ ঠিক ভাবে করতে পারে নাই।

এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার সাবেক উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফজিকুল ইসলাম মামলার বাদী তার স্ত্রীর সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।

আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘এই মামলার তদন্ত ডিবিতে। এসআই বেলায়েত এটার তদন্তকারী কর্মকর্তা।’

ঢাকা জেলা উত্তর ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘গতকালকেই আশুলিয়া থানা থেকে মামলার তদন্ত আমাকে দেয়া হয়েছে। এই মামলায় আগেই এজাহার নামীয় তিন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো। তারা সবাই কারাগারেই আছেন বলে জেনেছি।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!