‘পয়সা’ দোহানে চলে না বাবা, ‘কাগজের ট্যাকা’ দ্যান

নিজস্ব প্রতিবেদক

৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধ নূর মোহাম্মদ পেশায় ভিক্ষুক। তবে নূর মোহাম্মদ আগে ভিক্ষুক ছিলেন না। সমাজের আট-দশটা মানুষের মত তারও সংসার ছিলো। ছিলো জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি কর্ম। তিনি কাজ করতেন নিজ এলাকার একটি রাইস মিলে। ধামরাইয়ের কুশুরা এলাকায় বসবাস তার। তিন ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে দুবেলা খেয়ে দিন ভালোই কেটে যাচ্ছিলো নূর মোহাম্মদের।

একদিন দুপুর বেলা রাইস মিলে কাজ করা অবস্থায় আচমকা অজানা এক শব্দে ঘন আঁধার নেমে আসে তার দু’চোখে জানান নূর মোহাম্মদ। রাইস মিলের যন্ত্রটির বেল্ট ছিড়ে গিয়ে সজোরে আঘাত হানে তার দুই পায়ে। মুহুর্তেই সঙ্গা হারিয়ে ফেলেন তিনি। পরে জ্ঞান ফিরলে নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকেন দেখেন তিনি। আর সেই দিনের পর থেকে আজও নূর মোহাম্মদকে চলতে হয় দুটি লাঠিতে ভর করে। দুই পা অচল হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে বেছে নেন লজ্জার পেশা ভিক্ষাবৃত্তি।

সাভারের নবীনগর এলাকায় অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধের বাইরে সড়কে প্লাস্টিকের মাদুর পেতে ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যস্ত নূর বলেন, মাঝে মধ্যেই তিনি এখানে বসে ভিক্ষা করেন। তবে ধামরাই থেকে বাসযোগে এতদূর আসতে ভীষণ কষ্ট হয় তার। কিন্তু পেটের খুধা তো আর এসব মানে না। তাই বিশ বছর ধরে এভাবেই ভিক্ষা করে চলেছেন তিনি।

দিনভর ‘একটা ট্যাকা দ্যান গো আব্বা’ এই বুলি আওড়িয়ে দু’হাত পেতে ভিক্ষা চান নূর মোহাম্মদ। কারো মনে দয়া হলে সাহায্য করে যান তাকে। আবার কেউ নাচ কুঁচকিয়ে চলে যান পাশ কেটে। আর এদের মধ্যে যদি কেউ ‘পয়সা’ সাহায্যে হিসেবে দেন। তখনি নামে বিপত্তি। নূর মোহাম্মদ তাকে চিৎকার করে ডেকে নিয়ে যেতে বলেন সেই সাহায্য।

ঐ সময় নূর মোহাম্মদকে ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে বলতে শোনা যায়, ‘এই যে বাপ নিয়া যান তো আপনার পয়সা। কাছে ট্যাকা থাকলে দুইডা দিয়া যান। আর না থাকলে কিছুই লাগবো না।

কেন পয়সা নিবেন না? এমন প্রশ্নে নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘দোকানে এক ট্যাকা আর দুই ট্যাকার পয়সা নেয় না। কিন্তু পাঁচ টাকার পয়সা নেয়।’

ভিক্ষার টাকা দিয়ে তার এত বড় সংসার চলে কিভাবে এমন প্রশ্নে তিনি শিরোনাম বিডিকে  বলেন, ‘ হারাটা দিন চিল্লায় চিল্লায় কোন দিন এক’শ। আবার কোন দিন দুই’শ ট্যাকা পাই। আর পোলা-মাইয়া গার্মেন্ট খাটে। কিন্তু আমাগো আর এহন দ্যাহে না। খাইতে তো অইবো। ভিক্ষা না কইরা করুম কি বাবা?’

শরীর খারাপ হলে কি করেন? উত্তরে নূর মোহাম্মদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘কি আর করমু বাবা। তহন শুইয়া শুইয়া আল্লাহ্রে ডাকি। আর ধার দ্যানা কইরা চলি। হেই সময় খুব কষ্ট হয়। কি করমু বুইঝা হারা পারি না’

নূর মোহাম্মদের সাথে কথা বলতে বলতে অনেকটা সময় পাড় হয়ে যায়। হঠাৎ লোকজনের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় আর প্রশ্নের উত্তর দিতে চান না তিনি। মনে মনে যে তিনি বিরক্ত হচ্ছেন সেটা বুঝতে পারি। বিদায় নিয়ে সরে যেতেই আবার ‘একটা ট্যাকা দ্যান গো আব্বা’ এই বুলি আওড়িয়ে দু’হাত পেতে ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেন নূর মোহাম্মদ।

আইআই/শিরোনাম বিডি

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: