রুগ্ন দশায় সাভারের তিন ইউনিয়ন পরিষদ ভবন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বর্তমান সরকারের উদ্যোগে দেশের অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী শিল্পাঞ্চল খ্যাত সাভার উপজেলার বারোটি ইউনিয়নের মধ্যে তিনটি ইউনিয়ন ভবন আজও রয়েছে রুগ্ন দশায়। নানা সংকটাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে জরাজীর্ণ ভবনেই জনপ্রতিনিধিরা সেবা প্রদান করে আসছেন দীর্ঘ দিন ধরে। দেশের অন্যান্য ইউনিয়ন পরিষদের ভবন গুলো যখন চাকচিক্যময় কমপ্লেক্স ভবনে দৃশ্যমান তখন উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়ন, আমিনবাজার ও কাউন্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চিত্র বেহাল।

ভাকুর্তা ইউনিয়ন
সাভার উপজেলার এই তিন ইউনিয়নের মধ্যে সবচেয়ে নিকটতম হচ্ছে ভাকুর্তা ইউনিয়ন। ঢাকা-২ আসনের অন্তর্ভুক্ত ইউনিয়নটির সাংসদ অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। ইউনিয়নের সাতাশটি গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার ও আয়তন ২১.৬ বর্গ কিলোমিটার।
জানা যায়, ভাকুর্তা বাজার এলাকায় বিট্রিশ সরকার শাসনামলে ইউনিয়ন পরিষদের জন্য ২২ শতাংশ জমি দান করেছিলেন হাজী রজব আলী নামে এক ব্যক্তি। পরবর্তীতে ১৯৭২-৭৩ সালে ভূমি রেকর্ডে রহস্যজনক ভাবে উক্ত জমির ২০ শতাংশ কৃষি অধিদপ্তরের নামে বরাদ্দ করা হয়। এরপর ১৯৮৪ সালে অবশিষ্ট দুই শতাংশ জমিতে অল্প পরিসরে নির্মাণ করা হয় ভাকুর্তা ইউনিয়ন পরিষদের ভবন। এঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন প্রায় ৭ বছর পূর্বে আদালতে রেকর্ড সংশোধনীর একটি মামলা করেন। যা আজও বিচারাধীন।

ইউনিয়ন পরিষদটিতে গিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের চাকচিক্যতা দেখা যায়নি। জরাজীর্ণ প্রায় ৪০ বছরের পুরাতন ভবনেই চলছে সেবা প্রদান। অন্ধকারাচ্ছন্ন ছোট ছোট চারটি কক্ষ রয়েছে ভবনের। এর মধ্যেও চেয়ারম্যান ও সচিবের জন্য জন্য বরাদ্দকৃত কক্ষ দুটি ছাড়া অপর দুটি কক্ষ এখন পুলিশ ফাঁড়ির দখলে। এছাড়া তথ্য সেবা কেন্দ্রের জন্য ব্যবহৃত কক্ষটি রয়েছে মূল ভবন থেকে বিচ্ছিন্ন। ফলে নানা সমস্যায় জর্জরিত ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে সেবা নিতে এসে হয়রানি হচ্ছেন বলে অভিযোগ এলাকার সাধারণ মানুষের। আর পরিপাটি পরিবেশের অভাবে সেবা প্রদান মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান খোঁদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাধারণ সদস্যরা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এক সাথে অনেক মানুষ কাজের জন্য ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে বসার জায়গা না পেয়ে দীর্ঘক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে হয়। এছাড়া পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় মেম্বারদেরও সেখানে গিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি ডাটা সেন্টারের জন্য ব্যবহৃত কক্ষটিতে নেই বসার সুব্যবস্থা। এছাড়া নানা সমস্যার কারণে পরিষদ ভবনে সেবা নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত বিরম্বনা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা।

ভাকুর্তা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমান সরকারের উদ্যোগে দেশের অন্যান্য ইউনিয়ন পরিষদ গুলোতে কমপ্লেক্স ভবন থাকলেও তারা দীর্ঘদিন যাবৎ মাত্র তিন কক্ষ বিশিষ্ট জরাজীর্ণ ভবনে নানাবিদ সমস্যার মধ্যে দিয়ে জনগণকে সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন। ভূমি রেকর্ডের ভুলের কারণে আজও তাদের ইউনিয়নের কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে দুই বার নতুন কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের জন্য ৬৫ লাখ টাকা সরকারি বরাদ্দ আসলেও তা ফেরত গেছে। তিনি রেকর্ড সংশোধনীর জন্য আদালতের সরণাপন্ন হলেও বিবাদীরা স্বাক্ষী দিতে না যাওয়ায় মামলাটি ঝুলে রয়েছে।

তিনি আরো জানান, এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে এখন একই ভবনের দুটি কক্ষ আবার ভাকুর্তা পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ব্যবহার করছেন। এতে করে জনগণকে সেবা প্রদান করা আরো বেশী কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তবে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই কেবল কক্ষ দুটি পুলিশদের ব্যবহার করতে দিতে তারা বাধ্য হচ্ছেন বলেও জানান এই জনপ্রতিনিধি।

কাউন্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদ। ছবি: শিরোনাম বিডি

কাউন্দিয়া ইউনিয়ন
রাজধানীর তুরাগ নদ বেষ্টিত সাভার উপজেলার আরেক ইউনিয়ন কাউন্দিয়া। ইউনিয়নটির চারদিক নদী থাকায় নেই কোন সড়কপথ। এই এলাকার প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্যমতে ১৯৮০ সালের পর কোন এক সময়ে নয়াবাজার এলাকায় ৫ শতাংশ জমির উপর চার কক্ষ বিশিষ্ট একটি একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। এরপর দীর্ঘদিন কেটে গেলেও উন্নয়নের কোন ছোঁয়া লাগেনি এই ইউনিয়নের পরিষদ ভবন ও গ্রাম গুলোতে।

জানা যায়, পরিষদ ভবনের পুরাতন অন্ধকারাচ্ছন্ন ছোট ছোট চারটি কক্ষের একটিতে গ্রাম্য আদালত ও একটি চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাকী দুটি কক্ষের একটি তথ্য সেবা কেন্দ্র ও সচিব এর জন্য এবং অপরটি কক্ষটি হলরুম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এতদিনেও কমপ্লেক্স ভবন না হওয়ার পেছনে সাংসদ ও চেয়ারম্যানের সুদৃষ্টির অভাব বলে জানিয়েছেন পরিষদের সাধারণ সদস্যসহ এলাকাবাসী।

ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোজাম্মেল হকের সাথে কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের সর্বশেষ অবস্থার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের জন্য সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ২৫ শতাংশ জমি প্রয়োজন। যার দলিল ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের নিকট জমা দিলেই কেবল কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের বরাদ্দ পাওয়া যাবে। কিন্তু সেই পরিমাণ খাস জমি তারা এখনও নির্ধারণ করতে পারেননি বিধায় তাদের কমপ্লেক্স ভবনটি নির্মাণ সম্ভব হয়নি।

১নং ওয়ার্ডের সদস্য আফাজ উদ্দিন ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী সদস্য মর্জিনা শিকদার একমত পোষন করে বলেন, তাদের ইউনিয়ন নদী বেষ্টিত এক দ্বীপ হওয়ার কারণে সরকারের সকল প্রকারের উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। রাজধানীর এত নিকটবর্তী হওয়া সত্বেও এখানকার হাজারো মানুষ আদিম যুগের মত প্রতিদিনি নৌকায় পাড় হয়ে শহরে যায়। এখানে ভালো মানের কোন হাসপাতালও নেই। গুরুতর অসুস্থ রোগী ও গর্ভবর্তীদের প্রসব বেদনা উঠলে নৌকাযোগে ঢাকার হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যায়। তাই এত বড় বড় সমস্যার সামনে কমপ্লেক্স ভবনের নির্মাণের বিষয়ে কারো গুরুত্ব নেই।

তারা আরো জানায়, তাদের সাধারণ সদস্যদের বসার কোন সুবিধা নেই। ছোট ছোট কক্ষ গুলোতে নেই পর্যাপ্ত আলো ও ফ্যানের সুব্যবস্থা। এমনকি বাধ্য হয়ে সচিবকেও তথ্য সেবা কেন্দ্রের কক্ষেই যৌথ ভাবে সেবা প্রদান করতে হয়।

কাউন্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান খাঁন শান্ত বলেন, এলাকায় সরকারি পতিত খাস জমি খুঁজে পাওয়া যায়নি বিধায় তারা নতুন কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের জন্য আবেদন করতে পারেননি। তবে ঘাসিরদিয়া পাঁচতানি গ্রামে ২৫ শতাংশ জমির সন্ধান মিলেছে। খুব শীঘ্রই উক্ত জমি ইউনিয়ন পরিষদের নতুন কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হবে বলেও জানান তিনি।

সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার পারভেজুর রহমান বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের মূল দ্বায়িত্ব চেয়ারম্যানগণের। ভাকুর্তা ইউনিয়নের জমি ভুলবশত রেকর্ডের বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। আর আমিনবাজার ও কাউন্দিয়া ইউনিয়নের কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানান তিনি।

আমিনবাজার ইউনিয়ন
রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে নিকটতম সাভার উপজেলার ইউনিয়ন এটি। ১৯৭৩ সালে তুরাগ নদীর পশ্চিম পারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক সংলগ্ন প্রায় ২ শতাংশ (০.২৫৬ একর) জমির উপর (বর্তমানে ঢাকা ব্যাংকের পিছনে) প্রতিষ্ঠিত হয়। ভবনটি ১৯৯৮ সালে পুনঃনির্মান করা হলেও বর্তমানে তিনটি কক্ষেই চলে প্রায় ৫ লাখ মানুষের সেবা প্রদান। ঢাকা-২ আসনের অন্তর্ভুক্ত ইউনিয়নটি খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের সংসদীয় এলাকা।

জানা যায়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ইউনিয়ন পরিষদ গুলোতে নতুন কমপ্লেক্ষ ভবনের চাকচিক্যতা থাকলেও স্বাধীনতার পর স্থাপিত ইউনিয়ন পরিষদ ভবনটি এখনও রয়েছে জরাজীর্ণ ও অবহেলিত। তিনটি কক্ষের মধ্যে একটিতে চলে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম। অপর কক্ষটিতে চেয়াম্যান, সচিব ও সাধারণ সদস্যরা ঘিঞ্জি পরিবেশে জনগণদের সেবা প্রদান করে আসছেন। ছোট অপর কক্ষটিতে চলে তথ্য সেবা কার্যক্রম। গত বছরে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য সরকারি ৩৩ শতাংশ খাস জমি বরাদ্দের জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নিকট আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত তা ঝুলে রয়েছে।

এলাকাবাসী অভিযোগ করে বলেন, রাজধানীর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার পরও সতেরটি গ্রাম নিয়ে গঠিত তাদের ইউনিয়ন পরিষদটি আজও অবহেলিত। দেশের অন্যান্য ইউনিয়ন পরিষদে নতুন ভবন থাকলেও তাদের নেই। এজন্য সেবা পেতে গিয়ে এত সংখ্যক মানুষের প্রতিনিয়ত নানা বিরম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। পূর্ববর্তী দায়িত্ব পালনকারী জনপ্রতিনিধিরা শুধু নিজেদের আখের গুছিয়েছেন। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ ও এলাকার উন্নয়নে তারা কোন কাজ করেননি বলেও অভিযোগ এলাকাবাসীর।

ইউনিয়নটির সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী সদস্য শাহনাজ পারভিন জানান, দীর্ঘ দিন যাবৎ তারা গাঁদাগাদি করে এলাকার মানুষদের সেবা প্রদান করছেন। কিন্তু এত সংখ্যক মানুষের জন্য এই পরিষদের এই অল্প পরিসরের জায়গায় সংকুলনা হয় না। তাই জনগণের সেবা প্রদান করতে গিয়ে তারা হয়রানিসহ নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছেন। এমনকি গ্রাম্য আদালতের কক্ষটির ছাদ ধসে পড়ে অবিরত। যা আমাদের সকলের জন্য আতঙ্কের!

ইউনিয়ন পরিষদটির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, রাজধানীর নিকটতম হলেও স্বাধীনতার পর হতে এই ইউনিয়ন অনেকটাই অবহেলিত। এটা অত্যন্ত দুঃখের বিষয় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের চেয়ারম্যানগণ যখন কমপ্লেক্স ভবনে বসে সুন্দর পরিপাটি পরিবেশে জনগণদের সেবা প্রদান করছেন। তখন চেয়ারম্যান হিসেবে পরিষদে তার বসার জায়গাটি আজও নির্দিষ্ট হয়নি।
তিনি আরো জানান, গত বছরে তিনি মাননীয় খাদ্যমন্ত্রী মন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের নির্দেশে ইউনিয়নের সালেপুর গ্রামের একটি সরকারি ৩৩ শতাংশ খাস জমি পরিষদের কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ চেয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নিকট আবেদন করেছেন। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসক মহোদয় ইউনিয়ন পরিষদের বেহাল দশা পরিদর্শন করলেও এখন পর্যন্ত ভূমির বিষয়টি সুরাহা হয়নি বলেও জানান এই জনপ্রতিনিধি।

আইআই/শিরোনাম বিডি

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: