সবাই উইশ করেছে, আমি যেন আবার ফিরে আসি: প্রধানমন্ত্রী

আগামী জাতীয় নির্বাচনে সব দল অংশ নেবে বলে আশার কথা জানিয়ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে ২০১৪ সালের মতো কেউ বর্জন করলে সরকারের কিছু করার নেই, ‘বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচন চায় এবং তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। এখানে এত দল, সেখানে কোন দল আসবে আর কোন দল আসবে না, সেটা তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। তাদের সিদ্ধান্ত তো আর আমি নিতে পারি না। এটা তাদের নিতে হবে।’ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগদান শেষে বুধবার গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এবং এর ফাঁকে যে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে কথা হয়েছে তারা সবাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন নির্বাচনেও নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে শুভাকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।যার সঙ্গে কথা হয়েছে, তারা সবাই আমাকে উইশ করেছে আমি যেন আবার ফিরে আসি। তবে জনগণ ভোট দিলে আছি, না দিলে নাই। আগামীতে যেন আবার দেখা হয় (প্রধানমন্ত্রী হিসেবে), এই কথা সবাই বলেছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের কারণে ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। এবারও তারা নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে। আর না হলে ভোটে আসবে না-এমনটাই বলছে।ওই নির্বাচনে বিএনপিকে আনতে প্রধানমন্ত্রী নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে এবার তিনি কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না, সেটি আগেও জানিয়েছেন, আজকেও জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘তখন বিরোধী দল বলতে পার্লামেন্টে যারা ছিল, তারা কিন্তু সাড়া দেয়নি। অন্যান্য যেসব দল সাড়া দিয়েছিল, আমরা তাদেরকে নিয়েই একটা নির্বাচন করি। সেই নির্বাচন ঠেকানোর নামে পুড়িয়ে পুড়িয়ে মানুষ মারা।’ ‘আপনারা চিন্তা করে দেখুন, আপনারা কাদের জন্য এত উদ্বেগ প্রকাশ করছেন? মানুষকে যারা মানুষ হিসেবে গণ্য করে না। মানুষকে যারা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করতে পারে, যারা মানুষের ওপর এত জুলুম করতে পারে, তাদের জন্য এত কান্নাকাটি, এত মায়াকান্না কেন, আমি বুঝতে পারি না।’ ‘এটা তো দেশবাসীকে বুঝতে হবে। কয়েক হাজার মানুষকে তারা পুড়িয়েছে। আপনারা তো সাংবাদিক। আপনারা কি খোঁজ নিয়েছেন, যারা মারা গেছে, তারা তো মারা গেছে, কিন্তু যারা পুড়ে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে, তারা পুড়ে এখন কী অবস্থায় আছে?’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকরা নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ জানালেও অনলাইনে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মানসম্মানসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরকারেরও উদ্বেগ রয়েছে।তিনি বলেন, ‘কোনো একজন সংসদ সদস্য হলেন। যদি এলাকায় তার অসম্মান হয়, সেটার কী হবে। সাংবাদিকরা উদ্বিগ্ন বুঝলাম, কিন্তু আমাদের উদ্বেগটা কে দেখবে?’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে আরো বলেন, ‘যরা মিথ্যা তথ্য দেবে না, ভুল তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করবে না, আমার মনে হয় তাদের উদ্বেগের কিছু নেই। যারা মিথ্যা প্রকাশ করেছে, তাদের জন্যই এটা উদ্বেগের বিষয়।’

তিনি বলেন, বিবিসি একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মিথ্য সংবাদ প্রকাশ করেছিল। প্রমাণ হওয়ার পর সবাইকে রিজাইন করতে হয়েছে। কিন্তু যার বিরুদ্ধে ওই সংবাদ প্রকাশ করা হলো, তিনি তো ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েই গেলেন। কিন্তু যে প্রকাশ করল, তার তো কিছু হলো না। তার যে সম্মানটা গেল, ক্ষতি হলো, তার ক্ষতিপূরণ হবে কিভাবে? পদ্মা সেতু নিয়ে অনেকের অনেক কথা মিথ্যা প্রমাণিত হলো। কিন্তু আমাদের যে ক্ষতিটা হলো, তার কী হবে?

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারও যদি অপরাধী মন না থাকে, ভবিষ্যতে অপরাধের পরিকল্পনা না থাকে, তার উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নাই। আগে তো সমন জারি করা হতো না, সরাসরি গ্রেফতার করা হতো।

তিনি আরও বলেন, ‘মিটিং-টিটিংয়ে যেসব মানুষদের দেখলাম, তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ারই কথা। তারা তো ফাইল নিয়ে রেডি হয়েছে আমাদের বিরুদ্ধে লিখবে— সরকার এই করেনি, ওই করেনি। আপনাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নাই। অন্তত আমি থাকতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নাই।’

সংবাদ সম্মেলনে বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদি বলেন, সম্প্রতি জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় লিটন দাস ফেসবুকে দেবী দুর্গার ছবি দিয়ে সবাইকে শারদীয় দুর্গা পুজার শুভেচ্ছা জানান। পরে সেই ছবিতে গালাগালিসহ প্রচুর নেতিবাচক মন্তব্য পড়ে। এগুলো মোকাবিলার জন্য কী পরামর্শ দেবেন?

এ প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই ধরনের নোংরামি যেন না হয়, সেই জন্যই সাইবার সিকিউরিটি আইন করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন নোংরামি গোটা বিশ্বের জন্যই বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমাদের সাংবাদিকরা এসব ঘটনা মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করি। শেখ হাসিনা আরও বলেন, লিটন দাস এত ভালো খেলেছে, তাকে কেন এমন বলা হলো আমি জানি না। আমি ব্যস্ত থাকায় এগুলো দেখতে পারিনি। তবে যারা এই ধরনের কাজ করে, তারা বিকৃতমনা। এদের কোনো নীতি-টিতি নেই।

এর আগে, যুক্তরাষ্ট্র সফরে গত ২৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে ভাষণ দেন এবং জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠক করেন।

দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আগে নির্বাচন হতো, একজন মিলিটারি ডিকটেটর থাকত। আমাদের সময়ে ট্রান্সপারেন্ট ব্যালট বক্স চালু করেছি, আরও বিভিন্ন অগ্রগতি আমাদের সময়ে হয়েছে। আমাদের সময়ে কতগুলো ভোট হয়েছে, আমরা তো হস্তক্ষেপ করিনি। বিএনপি থাকলে তো সিল মেরেই নিয়ে নিত কিংবা রেজাল্ট আটকে ভোট বদলে দিত।

বাংলাদেশকে নিয়ে অনেকেই ষড়যন্ত্র করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ষড়যন্ত্রের উর্বর ভূমি। কিছু মানুষ সবসময় অপেক্ষা করে, মানুষ ভালো থাকলে যেন তারা ষড়যন্ত্র করতে পারে। এই বাংলাদেশের বাংলাদেশের যে এত উন্নতি, এর সবকিছুই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুরু করে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, ১৯৭৫ সালে তাকে হত্যা করা হলো। এরপর যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তারা আর দেশের উন্নয়নে কোনো কাজ করেনি। আজ কি দিন বদল হয়নি? মানুষ খাবার পাচ্ছে না?— প্রশ্ন রাখেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন তারা অপেক্ষা করছে, সরকার চলে যাবে। এমন একজন আসবে যাদের চাল নাই, চুলা নাই; কিন্তু ক্ষমতায় আসার খায়েস আছে। তাদের খায়েস পূরণ করতে গিয়ে তো খেসারত দিতে হয় জনগণকে। ১০ বছর ক্ষমতায় আছি, দেশের মানুষ শান্তিতে আছে। আমাদের তরুণদের জন্য শিক্ষা-গবেষণার সুযোগ আমরা করে দিয়েছি। চাকরির জন্য যেন মুখাপেক্ষী না হতে হয়, সে জন্য তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ করে দিয়েছি। কিন্তু তারপরও পত্রিকায় লেখা হয়, সরকার এইখানে ফেল করেছে। ওটাই তাদের আত্মসন্তুষ্টি। কিন্তু আমরা নিজেদের স্বার্থের জন্য রাজনীতি করি না, মানুষের জন্য ।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকটে সমাধানে মিয়ানমারের ভেতরে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠাসহ তিনটি প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ২৪-এ সেপ্টেম্বর আমি জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের উদ্যোগে আয়োজিত High Level Event on the Global Compact on Refugee: A Model for Greater Solidarity and Cooperation-এ অংশগ্রহণ করি। জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্ট এবং বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ এ ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেন। তারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানের জন্য তিনটি সুপারিশের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী বলেন,
১. মিয়ানমারকে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বৈষম্যমূলক আইন, নীতিমালা ও প্রথাগুলি বাতিল করতে হবে। এ সঙ্কটের মূল কারণগুলি খুঁজে বের করে তার প্রকৃত এবং সময়োপযোগী প্রতিকার করতে হবে।

২. মিয়ানমারকে অবশ্যই একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ লক্ষ্যে আস্থা সৃষ্টি ও সব রোহিঙ্গা নাগরিকের জন্য সুরক্ষা, অধিকার এবং নাগরিকত্ব লাভের উপায় নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন হলে সব নাগরিকের সুরক্ষার জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরে একটি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ তৈরি করতে হবে।

৩. মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতা প্রতিরোধে জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের সুপারিশমালা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

এ ইভেন্টটি ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের বিভিন্ন সেশন, ওআইসি’র সভা, রোহিঙ্গা ইস্যুটি তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান, বিভিন্ন আন্তজার্তিক সংস্থার প্রধানদের বৈঠকে এ সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেন এবং সমাধানে মিয়ানমারকে চাপ প্রদানসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: