স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ সাধারণ জনগণল

সাভার প্রতিনিধি:

ঢাকার সাভারে সেচ্ছাসেবক লীগের এক নেতার চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ এলাকার ব্যবসায়ীসহ সাধারণ জনগণ। বাড়ি নির্মাণ কিংবা ব্যবসা পরিচালনা করতে গেলেই দাবী করেন বিভিন্ন অঙ্কের চাঁদা। না পেলেই শুরু হয় অত্যাচার। দলবল নিয়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়। লুট করা হয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মূল্যবান জিনিসপত্র ও নগদ টাকা। নির্মমতার শিকার ভুক্তভোগীরা একাধিক অভিযোগ দায়ের করলেও মেলেনি সুরাহা। দলীয় প্রভাব আর পুলিশের হেয়ালি মনোভাবের কারণে দিন দিন এই নেতা বেপরোয়া হয়ে উঠছেন বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। অভিযোগ আছে, একাধিক চাঁদাবাজির মামলা ও অস্ত্রসহ মাদক ব্যবসায়ীদের প্রশ্রয় দিয়ে আসলেও স্বেচ্ছাসেবক লীগের পদে তিনি রয়েছেন বহাল।

অভিযুক্ত কামরুল হাসান নয়ন ঢাকার সাভার উপজেলার পাথালিয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক। সে পানধোয়া এলাকার আব্দুল কাদেরের ছেলে।

আশুলিয়া থানা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট চাঁদাবাজি ও হত্যার উদ্দেশ্যে জখমসহ ২৭ লক্ষাধিক টাকা লুটের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় কামরুল ইসলাম নয়ন প্রধান আসামি। এ মামলায় তার সঙ্গীয় ফেরদৌস আলম ও ইউসুফ আলীসহ অজ্ঞাত আসামি আরো ৪/৫জন। এছাড়া ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নজরুল ইসলাম নামে এক দোকানীকে মারাত্মক আহত করে লুটপাটের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কামরুল ইসলাম নয়ন ও নিলয় নামে দুই জন আসামি।

তবে আশুলিয়ার পানধোয়া এলাকায় ইতোপূর্বে ২০১৪ সালে অস্ত্র ও মাদকসহ রনি মিয়া ও মো, খোকন নামে আরো দুই সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। যারা স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা কামরুল ইসলাম নয়নের ঘনিষ্ঠ সহচর। যাদের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী।

ভুক্তভোগী শামিম শেখ জানান, পানধোয়া এলাকায় বাড়ি নির্মাণ কাজ করছেন তিনি। বেশ কয়েক দিন ধরেই ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা নয়ন। এতে অস্বীকৃতি জানালে গত ২ ফেব্রুয়ারি নয়ন তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে বাড়িতে ঢুকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা নয়ন। এতে অস্বীকৃতি জানালে তার দুই ছেলে মো. রনি ও ফয়সালকে ধারালো অস্ত্র ও লোহার রড দিয়ে রক্তাক্ত জখম করেন। স্ত্রীকেও বেধরক পিটিয়ে আহত ও লাঞ্ছিত করেন। এঘটনায় ভুক্তভোগী শামিম শেখ থানায় লিখিত অভিযোগ করলেও পুলিশ নীরব ভূমিকায়। ঘটনার এক সপ্তাহ পার হলেও পুলিশ মামলা নিচ্ছে না।

দরিদ্র চা দোকানী নজরুল ইসলাম বলেন, আমার কাছে ডেইলি এক পেকেট ফ্রি সিগারেট চায় হেই (নয়ন)। পরে আমি দেই নাই দেহি আমার দোহানু থাকি আমারে ডাইকি হেই অফিসে নিয়া যায়। পরে হের অফিসে গেলে হেই সাটার ফালায় দিয়া কুনু বোঝার আগেই আমারে বাড়ি। মাতায় আমার রড দিয়া বাড়ি দিছে। আমি দুই হাতে ধরছি বাড়িডা। পরে আমার হাতে পায়ে রড দিয়া মারছে। বহুদিন হাসপাতালে গেছি, ওষুধ খাইছি। এহুনু (এখনও) আমার পায়ো (পা) ঠিক হয় নাই। মামলাও করছিলাম। কিন্তু হেই (নয়ন) আগেই জামিন নিয়া আয়া পড়ছে।

স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা নয়নের হামলার শিকার হয়েছেন ওই এলাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ী কার্তিক চন্দ্র ঘোষ। ২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট পানধোয়া বাজার এলাকায় পূর্ণ জুয়েলার্সে ৫০ হাজার টাকা চাঁদার জন্য দিনে দুপুরে হামলা চালায় নয়ন ও তার বাহিনী। দোকানে থাকা দুইজনকে জখম করে লুট করা লুট করা হয় বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার। এঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী কার্তিক। কিন্তু পুলিশের নজর ফাঁকি দিয়ে জামিনে মুক্ত হন অভিযুক্ত স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা নয়ন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ৫০ হাজার টাকা চাঁদা না পেয়ে কামরুল হাসান নয়ন ও তার সঙ্গীয় ইউসুফ আলী, ফেরদৌস আলম পূর্ণ জুয়েলার্সে তিনটি মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাস যোগে এসে হামলা চালায়। এসময় হামলাকারী রড, ছ্যান, চা পাতি ও হাতুড়ি অস্ত্র ব্যবহার করেন। দোকানে থাকা কার্তিক চন্দ্র ঘোষের বড় ভাই জ্যোতি লালকে সন্ত্রাসী ইউসুফ হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি সরে গেলে তার ডান হাত ভেঙ্গে গুরুতর জখম হয়। এসময় নয়ন চা পাতি দিয়ে জ্যোতির মাথায় কোপ দেয়া হলে রক্তাক্ত জখম করেন। এতে জ্যোতি লালের ছেলে বিজয় বাঁধা দিতে গেলে তার মাথায় রড দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত করেন ফেরদৌস। পরে দোকানের সোকেস ও সিন্দুক ভেঙ্গে প্রায় সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণ, ২৯২ ভরি রূপা ও নগদ প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা লুট করে পালিয়ে যায় নয়ন ও তার বাহিনী।

পানধোয়া বাজার সমিতির সভাপতি এরশাদ হোসেন বলেন, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা নয়ন মাঝে মধ্যে বাজারের ব্যবসায়ীদের উপর নির্যাতন চালায়। বিভিন্ন সময় তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ভুক্তভোগীসহ এলাকাবাসী মিলে মানববন্ধন করছি। কিন্তু আমরা কোন সুফল পাইনি। বরং বারবার তার অত্যাচারের শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। মূলত পুলিশ ও দলগত ভাবে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় সে বেপরোয়া হয়ে পড়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে পাথালিয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান নয়ন বলেন, ‘বিষয়টা হচ্ছে ভাই আপনারে আমি কি বলব। আমার ভাষা আমি হারাই ফালাইছি। এই মারামারির (শামিম শেখের অভিযোগ) সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না। এখন আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আছে তারা আমার এই হ্যাস্তন্যাস্তটা করতেছে।’

এছাড়া আরো দুটি চাঁদাবাজির মামলার বিষয়ে বলেন, ‘আমার এলাকায় রিকশায় চাঁদা উঠাইতো। ওই চাঁদাটা আমি বন্ধ করাইছি। সেটা রিকশাওয়ালাদের ডাইকা বইলেন। কাঁচাবাজারে যে চাঁদাটা আমি বন্ধ করছি ভাই। আর এসব বিষয়ে ক্ষুব্ধ হয়েই আমার বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা মামলা দিছে।’

আশুলিয়া থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি শহীদুল্লাহ মুন্সী বলেন, কিছু করলেতো আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নিবো। আমাদের কাছেতো কোন অভিযোগ আসে নাই। আমরাতো অপরাধীদের কখনও ছাড় দেবো না।

আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম বলেন, পানধোয়া বাজারে চাঁদার জন্য বাড়ি নির্মাণ কাজে বাধা ও মারধর করে জখমের ঘটনায় অভিযোগ পেয়েছেন। বিষয়টি এখনো আমাদের এসআই হারুন তদন্ত করে দেখছে। আমি তদন্তকারী অফিসারের সাথে কথা বলে দেখছি।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: