হাহাকার নিয়ে অর্ধযুগ দাড়িয়ে তাজরিন ভবন

নিজস্ব প্রতিবেদক

নহঞনিত্য ভোরে সূর্যের আলো ফোটার সাথে হাজারো শ্রমিকের আগমনে কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠতো নিশ্চিন্তপুরের তাজরিন ফ্যাশন ভবনটি। দিনভর কর্মযজ্ঞতায় কোলাহল থাকতো সেখানে। নয় তলা ভবনের প্রতিটি ফ্লোর থাকতো মানুষে পরিপূর্ণ। কিন্তু সাত বছর আগের এক ভয়ানক নৃশংসতা কেড়ে নিয়ে গেছে সব। ভবনের ভিতর আটকে আগুনে পুড়ে মারা গেছে শতাধিক তাজা প্রাণ। এ নৃশংসতার অর্ধযুগ পেরিয়ে মরে যাওয়া মানুষ গুলোর হাহাকার নিয়ে দাড়িয়ে আছে নিশ্চিন্তপুরের তাজরিন ভবন।

নিশ্চুপ হয়ে ঠায় দাড়িয়ে থাকা এই বহুতল ভবনটিতে একসময় উৎপাদন কাজে রাত-দিন ২৪ ঘন্টাই সরগরম থাকতো। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর ভয়াবহ এক অগ্নিকান্ডের ঘটনার অর্ধযুগ পর এখানে কেবলই বিরাজ করছে শুনসান নিরবতা। জনশূণ্যতা আর ভুতুরে পরিবেশে অর্ধযুগ ধরে পরিত্যক্ত আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরিন ফ্যাশন ভবনটি।

আজও ভবনের ভিতর আটকে থাকা মানুষ গুলোর আর্তচিৎকার আর সেদিনের আগুনের লেলিহান শিখার রাক্ষুসে চেহারা চোখে ভাসে বলে জানালেন নিশ্চিন্তপুরবাসী।

তালাবন্ধ ভবনের পাশে গিয়ে বাইরে থেকে দেখা গেল ভবনটির বিভিন্ন স্থানে পুড়ে যাওয়া ক্ষত যেন আজো বহমান। পুড়ে যাওয়া দেওয়ালের সূক্ষ্ম চিহ্ন যেন শরীরকে শিওরে তোলে। একসময়ের পরিপাটি ভবনের চারপাশের দেয়ালে পোড়া কালচে বরণ যেন ছাপ রেখে গেছে নির্মমতার। প্রচন্ড তাপে বেঁকে যাওয়া জানালার গ্রিল ও এডজাস্ট ফ্যানের পাখা গুলো দেখে মনে হয়, কত না কষ্টতেই প্রাণ গিয়েছিল মানুষ গুলোর! অর্ধযুগ ধরে ভবনটি যেন ঠায় দাড়িয়ে এক নির্মম হাহাকার জানান দিচ্ছে।

কথা হয় তাজরীনের সেই ভবনের পাশের বাসিন্দাদের কয়েকজনের সঙ্গে। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিলেন তারা। বললেন, সেদিন সন্ধ্যার দিকে তাজরিন ফ্যাশনস পোশাক কারখানাটির নিচ তলার তুলার গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা পুরো নয় তলা কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় কারখানাটির সহস্রাধিক শ্রমিক জীবন বাঁচাতে ভবন থেকে নামার চেষ্টা করেন। সেদিন জীবন বাঁচাতে শ্রমিকরা চিৎকার করছিলেন। আজও কানে বাজে শ্রমিকদের ‘বাঁচাও বাঁচাও’ আর্তনাদ।

তারা আরো বলেন, সকাল হলেই একসময় যে কারখানাটি কর্মব্যস্ততায় মুখরিত থাকতো। অগ্নিকান্ডের পর থেকে এখন অব্দি এটি বন্ধ পড়ে আছে। তেমন কেউ না আসায় সব সময় এখানে শুনশান নিরবতা বিরাজ করে। এত বড় ভবনটি এখন ভুতের বাড়ির মত হয়ে গেছে।

এলাকাবাসীদের অনেকের মতে, ভবনটির বেশ কিছু অংশ আবারো রিপেয়ারিং করা হয়েছে। ভেতরে মালিকের লোকজনও থাকে। মাঝে মধ্যে দুই-একটি বড় কাভার্ডভ্যানও ভিতরে দেখা যায়। এছাড়া তাজরিনের ভবনের দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন বয়স্ক এক ব্যক্তি। কিছুটা উদ্ভট প্রকৃতির এই লোকটি বছর পূর্তি এলেই যেন থাকেন বাড়তি সতর্কতায়। কেন না এই সময় সাংবাদিকরা এসে ভবনের ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন বলে ভেতর থেকে প্রধান ফটক আটকে রাখেন তিনি। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতেও বেশ নারাজ তিনি।

এদিকে তাজরীন ফ্যাশন কারখানার স্থানে সরকারিভাবে শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল ও ডরমেটরি নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র সাভার-আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু দাবি জানিয়ে বলেন, অগ্নিকান্ডের ঘটনায় যখন জীবন বাঁচাতে শ্রমিকরা চিৎকার করছিলেন। তখনও খুনি মালিক দেলোয়ার হোসেন কারখানা থেকে বের হওয়ার সব গেটে তালা লাগিয়ে রাখেন। প্রাণে বাঁচতে অনেক শ্রমিক ভবনটির বিভিন্ন তলা থেকে লাফিয়ে পড়েন।

তাই এই ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকন্ড বর্ণনা করে আইএলও কনভেনশন-১২১ অনুসারে শ্রমিকদের সারাজীবনের আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদান, পুনর্বাসনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও সন্তানদের লেখাপড়া নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

এছাড়া তাজরীন ফ্যাশন কারখানার স্থানে সরকারিভাবে শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল ও ডরমেটরি নির্মাণ করার দাবি জানান এই শ্রমিক নেতা।

আইআই-এআইএস/শিরোনাম বিডি

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
%d bloggers like this: