দেয়াল চাপায় শ্রমিকের মৃত্যু, ‘টাকায় রফাদফা’

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার সাভারে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে দেয়াল ধসে চাপা পড়ে পারভিন আক্তার প্রিয়া নামে এক নারী পোশাক শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয়রা নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রীর কারণেই ‍দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে। আবার পুলিশের পক্ষ থেকেই টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মিমাংসার কথাও জানানো হয়েছে। এমনকি মৃত্যুর আট ঘন্টা পরও মিমাংসার টাকার জন্য হাসপাতালের সামনে মরদেহ নিয়ে নিহতের স্বজনদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। যদিও এসময় তারা মিমাংসার নামে টাকা নেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।

নিহত পারভিন আক্তার কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী থানার খামার আন্দারিঝাঁড় গ্রামের নজরুল ইসলামের মেয়ে। তিনি আশুলিয়ার শিমুলতলা এলাকায় প্রাইম ক্যাপ (বিডি) নামের একটি কারখানায় কাজ করতেন।

বুধবার বিকেল ৩টার দিকে আশুলিয়ার নারী ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের ভিতর নিহত নারী শ্রমিক প্রিয়া আক্তারের মরদেহ নিয়ে তার ভাইকে বসে থাকতে দেখা গেছে।

যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে প্রিয়া আক্তারকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। এর ঠিক দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। পরে সকালে আমরা পুলিশকে জানালেও অন্যত্র কাজে ব্যস্ততার কথা জানিয়ে ২টার দিকে হাসপাতালে আসে।

ঘটনাস্থল আশুলিয়ার শিমুলতলা এলাকায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোর বেলা ওই শ্রমিক গলির পথ দিয়ে কারখানায় যাচ্ছিলেন। এসময় হঠাৎ মেসার্স মেহেদী এন্টারপ্রাইজ নামে ইট-বালু সাল্পায়ার প্রতিষ্ঠানের একটি দেয়াল তার উপর ধসে পড়ে। এতে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হলে তাকে স্থানীয়রা নিকটস্থ নারী ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতালে পাঠায়।

তারা আরও জানান, নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে দেয়ালটি নির্মাণ করায় এটি ধসে পড়েছে। দেয়াল নির্মাণের সময় মালিক সিমেন্ট ব্যবহার করেন নাই বললেই চলে। যে কারণে এই দুর্ঘটনায় এক শ্রমিক মারা গেলে। এর বিচার হওয়া দরকার।

অভিযোগ উঠা মেসার্স মেহেদী এন্টারপ্রাইজ নামে ইট-বালু সাল্পায়ার প্রতিষ্ঠানের স্বত্তাধিকারী মেহেদী হাসানকে ঘটনাস্থলে গিয়ে পাওয়া যায়নি। এমনকি মুঠোফোনেও তার সাড়া মেলেনি।

তবে জায়গার মালিক মোক্তার হোসেন বলেন, ‘আমি মেহেদী হাসানের কাছে জমি ভাড়া দিছি। ওখানে তিনি বাউন্ডারি বানিয়ে ইট-বালুর ব্যবসা করেন। তিন-চার মাসে আগে ওই বাউন্ডারি করা হইছিলো। গেল রাতে এক বালি নামাইছিলো এক গাড়ি। বালিটা ওয়ালের সাথে চাপ দিয়া নামাইছিলো। রাতে আবার বৃষ্টি হইছিলো এই কারণে মনে হয় বালুর চাপে ওয়ালটা ধইসা পড়ছে।’

মিমাংসার বিষয়ে বলেন, ‘আমার সাথে কোন কথা হয় নাই। আমিতো জানি না। ওরা ওরা মনে হয় যে, বাদী-বিবাদী মিলা গেছে সেটা আমি জানি না।’

ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক এসআই তানিম হোসেন বলেন, ‘ওইটা বাদী-বিবাদী মিটমাট হয়ে গেছে। ওরা ময়নাতদন্তও করবে না। ওরা খুব রিকোয়েস্ট করছে। তার (নিহতের) বাবা আসে নাই। তার বড় ভাই আর দুলাভাই আসছে দুইজন। নিকটাত্মীয়ের ভিতরে এ তিনজন আছে। ’

‘তবে তার বাবার সাথে ফোনে কথা হইছে। উনি খুব কান্নাকাটি করতেছে। আর বলতেছে, আপনার কাছে আমার অনুরোধ, আমার মেয়েটাকে অক্ষত অবস্থায় আমার কাছে দিয়ে দেন। এমনিতেও দেয়াল ধসে মেয়েটা অনেক কষ্ট পাইছে। আমি ওসি স্যারকে জানাইছি। পরে বিকেলে মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই তার স্বজনরা নিয়ে গেছে।’

দেয়াল ‘সিমেন্ট-ইট দিয়ে কোন ভাবে দেয়ালটা করা কোনরকম আর কি। খুব একটা মজবুত মনে হইলো না। বালু রাখছিলো আর বালুর চাপেই ধইসা পড়ছে।’

কত টাকায় মিমাংসা হয়েছে এমন প্রশ্নে বলেন, ‘ওরা হয়তো কিছু সামথিং ক্ষতিপূরণ দিবে।’হসপিটাল থেকেই দেরি হচ্ছে।

অ্যাম্বুলেন্সের ভিতর বোনের লাশ নিয়ে অপেক্ষারত বড় ভাই আব্দুর রাজ্জাকের সাথে কথা বললে তিনি অসংলগ্ন উত্তর দেন।

তিনি বলেন, ‘এক্সিডেন্টই এটা হইছে। দারোগার সাথে কথা হইছে। অভিযোগ করছি। এটা ভুল কথা, টাকা নেই নাই। শুধু অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ১৫ হাজার ওনারা দিছে। যাদের ওয়াল ভাইঙ্গা পড়ছে ওনারাই দিছে।’

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!