বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড, তারেকের যাবজ্জীবন

দীর্ঘ ১৪ বছর পর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৭ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আজ বুধবার (১০ আগস্ট) দুপুরে এ রায় ঘোষণা করা হয়। বিভীষিকাময় সে ঘটনার পর একে একে কেটে গেছে প্রায় ১৪টি বছর। মতিঝিল থানায় হওয়া হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।  দীর্ঘদিন পর ইতিহাসের জঘন্যতম হামলার বিচার আলোর মুখ দেখলো।

উল্লেখ্য ২০০৪ সালের পরদিন অর্থাৎ ২২ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার মতিঝিল থানার এসআই ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলা করেন। তদন্ত শুরু করে থানা পুলিশ। এরপর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ হয়ে তদন্তের দায়িত্ব যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) হাতে। এরই সাথে আরও দুটি মামলা করেন আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল জলিল ও সাবের হোসেন চৌধুরী। এ সব মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়।

২০০৪ সালের ২২ আগস্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনকে চেয়ারম্যান করে এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে সরকার। এক মাস দশ দিন পর অর্থাৎ ২ অক্টোবর সরকারের কাছে ১৬২ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযানটি পরিচালনা করা হয়েছিল ভাড়া করা দুর্বৃত্তদের মাধ্যমে। এ সব লোক প্রধানত একটি সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডারদের মধ্য থেকে নেয়া হয়, যাদের সমাবেশে ভিড়ের মধ্যে মিশে যাওয়ার মতো ভালো জ্ঞান ছিল।

২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগের একটি চায়ের দোকান থেকে আটক করা হয় একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্তের এক আলোচিত চরিত্র জজ মিয়াকে। আটকের পর তাকে নেয়া হয় সেনবাগ থানায়। পনেরো দিন সিআইডি পুলিশের হেফাজতে থাকার পর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর গ্রেনেড হামলার মামলায় জজ মিয়া ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ দেন। এমনটাই জানায় পুলিশ।

জজ মিয়ার ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ পুলিশের সাজানো ঘটনা এমন প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে চারিদিকে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। প্রতিবেদনে তাকে আসামি করার বদৌলতে তার পরিবারকে টাকা দেয়ার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।

২০০৮ সালে জজ মিয়াকে আসামির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এরপর অভিযোগপত্র জমা দেয় সিআইডি। পরে আদালতও এ মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেন। ২০০৯ সালে খালাস পান পুলিশের সাজানো নায়ক জজ মিয়া।

তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ১১ জুন মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির। ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন।

এরপর মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডির পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আকন্দ। ২০১১ সালের ৩ জুলাই তিনি বিএনপি নেতা তারেক রহমানসহ ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ৫২ জনের নামে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন।

গ্রেনেড হামলার ঘটনার মামলায় ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। চার্জশিটে নাম উঠে আসে তারেক-বাবরের। সেদিন বিশেষ নিরাপত্তার মধ্যে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা-সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আকন্দ স্বাক্ষরিত চার্জশিটটি দাখিল করেন এসআই গোলাম মাওলা। দুটি পৃথক ট্রাঙ্কে ভর্তি করে আনা চার্জশিটে নতুন করে ৩০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

এর আগের চার্জশিটে ২২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। অভিযুক্তদের তালিকায় নতুনভাবে যাদের যোগ করা হয় তাদের মধ্যে বিএনপি নেতা তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ উল্লেখযোগ্য।

অন্য মামলায় জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গি নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও জেএমবি সদস্য শহিদুল আলম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড ইতোমধ্যেই কার্যকর হওয়ায় মামলা থেকে তাদের নাম বাদ যায়।

এ পর্যন্ত ২১ আগস্ট হামলা মামলার মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯ জনে। এর মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৮ জন পলাতক রয়েছেন। বাকি আসামিদের মধ্যে কারাগারে রয়েছেন ২৩ জন এবং জামিনে ছিলেন ৮ জন। জামিনে থাকা আট জনের জামিন বাতিল করে আদালত।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতকে জানান, ওই হামলার আগে ঢাকায় ১০টি বৈঠক হয়। এ সব বৈঠকে তারেক রহমান, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, হারিছ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। টাকা ও গ্রেনেড আসে পাকিস্তান থেকে।

আইনজীবীরা বারবার বলেছেন যে, তারা মনে করেন ওই হামলার উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা ও আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করা। হামলার কাজে পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিনের আবদুল মজিদ বাট বাংলাদেশে অবস্থান করছিল। বাংলাদেশে হামলা চালায় জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের সদস্যরা।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সম্পূরক চার্জশিটে তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে আরো অনেকের নাম আসে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আদালতে এসব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা হয়। তবে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা মনে করেন মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে।হামলার প্রথম সাত বছরের মধ্যেই তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয় মোট ছয়বার। প্রথম তদন্ত হয় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে। সে সময় কোনো প্রতিবেদন দাখিল হয়নি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নতুন তদন্তে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ জুন অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ওই অভিযোগ পত্রে মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও গ্রেনেডের উৎস ও মদদদাতাদের সনাক্ত করা হয়নি। বর্তমান সরকার আমলে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর আদালত মামলার বর্ধিত তদন্তের আদেশ দেন। ১৩ দফা সময় বাড়িয়ে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র জমা দেয়ার মধ্য দিয়ে গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্ত শেষ হয়।

২০১২ সালের ২৮ মার্চ মামলার বিচার শুরু হয়। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ ৫২ জন আসামির বিরুদ্ধে বিচার কাজ শুরু হয় ২০১২ সালের ২৮ মার্চ। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল একই বছর ৯ এপ্রিল পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়।

এর আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে বিশেষ ট্রাইবুনালে একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার শুরু হয়েছিল। বহুল আলোচিত এ মামলায় ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। আরও ২০ জনের সাফাই সাক্ষ্য নেয়া হয়।

তবে মামলার বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা পরস্পরকে দায়ী করেছেন। চলতি বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর শেষ হয় বিচার প্রক্রিয়া। ১১৯তম কার্যদিবসে মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হয়। এর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ ৩০ ও আসামিপক্ষ ৮৯ কার্যদিবস ব্যয় করেছে।এই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ১০ অক্টোবর রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: