লকডাউনে চাঙ্গা চাঁদাবাজি

নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনার ভয়াবহতা ঠেকাতে তৃতীয় দিনের মতো সারা দেশে চলছে সরকারের কঠোর লকডাউন নির্দেশনা। গণপরিবহন চলাচলেও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে এ নিষেধাজ্ঞা যেন উপেক্ষিত। নির্দেশনা অনুযায়ী শিল্প কারখানা গুলো থেকে শ্রমিকদের পরিবহন সেবা দেয়ার কথা থাকলেও এই কয় দিনে তাও কার্যকর হয়নি। তাই ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক, রিকশা, ভ্যান ও লেগুনায় কয়েক গুণ বেশি ভাড়ায় শ্রমিকরা গিয়েছেন কারখানায়। আর এই সুযোগে যেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চাঁদাবাজি। প্রতিদিন নবীনগর-চন্দ্রা ও টঙ্গী-আশুলিয়া ইপিজেড সড়কে চলাচলরত হাজারো ব্যাটারি চালিত থ্রি হুইলার প্রতি ১০-৩০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা উত্তোলনের অভিযোগ করেছেন চালক ও যাত্রীরা। ট্রাফিক পুলিশের সামনেই কমিউনিটি পুলিশের এমন চাঁদাবাজির ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন অনেকেই।

জনসাধারণের ভাষ্য, লকডাউনকে পুঁজি করেই চাঁদাবাজরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা থ্রি হুইলার যান থেকে চাঁদা উত্তোলন করায় এসব যানের চালকরা সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করছে।

কঠোর লকডাউনের দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা থেকেই আশুলিয়ার নবীনগর-চন্দ্রা ও টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড ব্যস্ততম সড়কে জটলা বাড়তে থাকে। সেই সাথে বাড়তে থাকে থ্রি হুইলার যানবাহনের সংখ্যাও। কিন্তু আজ শুক্রবার সরকারি ছুটির দিন কারখানা বন্ধ থাকায় এই চিত্র ছিল ভিন্ন। তবে কঠোর লকডাউন শুরুর গত দুই দিন আশুলিয়ার বাইপাইল ত্রিমোড় এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি ছিল উপেক্ষিত। বেশ কিছু কারখানার পরিবহন সেবা থাকলেও শ্রমিকদের বহনকারী সেই বাসটিতেও দেখা যায় গাঁদাগাদির দৃশ্য। কারখানার পরিবহন সেবা না পেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভাড়ায় থ্রি হুইলার যান গুলোতে গাঁদাগাঁদি করেই শ্রমিকদের যেতে হয়েছে কারখানায়। আবার বেশিরভাগ শ্রমিকদের দল বেধে হেটেই কারখানার ২-৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে দেখা গেছে।

বৃহস্পতিবার ভোর ৬টার দিকে বাইপাইল ত্রিমোড়ে লকডাউন পরিস্থিতর খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ক্যামেরায় ধরা পরে কমিউনিটি পুলিশের চাঁদাবাজির দৃশ্য।

এসময় পাশেই এক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে থাকলেও চাঁদাবাজির বিষয়টি দেখা যায়নি নজরে নিতে। এমনকি চাঁদাবাজির স্থল থেকে অল্প দূরেই ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে প্রকাশ্যে এমন চাঁদাবাজিতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ।

কমিউনিটি পুলিশের পোশাক পরিহিত মো. মঞ্জু নামে এক চাঁদাবাজের কাছে কারণ জানতে গেলে সে চাঁদা উত্তোলনের বিষয়টি অস্বীকার করেন। এক পর্যায়ে ইজিবাইক চালক ও জনরোষে সে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালিয়ে যান।

ঘটনার সময় উপস্থিত বাইপাইল ত্রিমোড় এলাকায় কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশ আব্দুল আজিজ বলেন, ‘এখানে আমার ডিউটি সকাল ৬টা থাইকা। কিন্তু ওরেতো আমি চিনি না। ওই সম্ভবত মাছের আড়তের কাজ করে। তবে সে টাকা উঠায় কি না সেটা কিন্তু আমি খেয়াল করি নাই।’

অটোরিকশা চালক সাজ্জাদ হোসেন অভিযোগ করেন, ‘লকডাউনের মইদ্দে আমাগোতো বাঁচতে হইব। ভোর বেলা থাইকা ফেক্টরির শ্রমিকগো ভাড়া মারি। কিন্তু যয়বার ইপিজেড ভাড়া মাইরা আহি ততবার হ্যাগো (ট্রাফিক ও কমিউনিটি পুলিশ) ১০/২০ ট্যাকা কইরা দেওন লাগে। ট্যাকা না দিলে গাড়ি ধইরা নিয়া যায়। আর এই জন্য আমরাও প্যাসেনজারগো কাছ থাইকা ১০-২০ ট্যাকা ভাড়া বেশি নিতাছি।’

রিকশার যাত্রী আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন, ‘ওই সমস্ত ট্রাফিক পুলিশ সবাই জানে এইখান থেকে টাকা নিচ্ছে। এটার অংশীদার ওরাও কিছু আছে। ওর মাধ্যমে ওরাও (ট্রাফিক পুলিশ) কিছু পায়। মনে করেন, একটা গাড়ি বা অটোতে যাত্রী আসলে ওরা এখানে আটকায়। আর যদি কিছু টাকা দেয় তাহলে সাথে সাথে আবার যাইতে দেয়। মূলত ওনাদের কারণেই চালকরা ভাড়াটা বেশি নিচ্ছে। চালকরা জানে এখান থেকে ভাড়া ২০ টাকা। কিন্তু পুলিশকে তাদের ১০টাকা দিতে হবে। এ জন্য পাবলিকের কাছ থেকে তারাও ২০ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা নিচ্ছে ।’

পথচারী মাওলানা গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমি দেখলাম উনি (কমিউনিটি পুলিশ) একজনের কাছ থেকে টাকা নিতাছে। টাকা দিতেই হবে ওই মুহুর্তে এবং আমি ওনাকে ধরার জন্য খুব পাকরাও করছিলাম। কিন্তু আমার হাত থেকে উনি দৌড় দিয়া পালায় যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণ গরীব মানুষরা রিকশা চালায় সংসার চালায়। ওরা ২০ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা এ জন্যই নেয় এখানে যারা ট্রাফিক পুলিশ আছে ওদেরকে ওরা (চালকরা) ট্যাক্স (চাঁদা) দিয়েই রিকশা চালায়। রিকশাওয়ালার যদি ট্যাক্স না দেয় তাহলে ওদের চাকা ফুটা করে দেয় অথবা অটো গুলা ধরে নিয়ে যায়। এই টাকাটা শুধু এই ট্রাফিক রেকার খায় না। ওদের উপরে যারা আছে তারাও খায়।’

বাইপাইল ট্রাফিক পুলিশের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর খসরু পারভেজ বলেন, ‘এটা আমরা খুব হার্ডলি দেখতেছি। এই যে আপনি এখন এটা বললেন, আমার এটা নোটিশে আসলো। আই উইল টেক দ্যা জাস্টিস অ্যাকশন দ্যা প্রবলেম অল দ্যা কমিউনিটি পুলিশ। আমার এটা জানা ছিল না। আমি এখানে নিউলি অ্যাপয়েনটেড এবং এটা যদি হয়ে থাকে অবশ্যই এটা অন্যায়। আর সেটার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নিব।’

কমিউনিটি পুলিশের সাথে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন অভিযোগের ব্যাপারে বলেন, ‘আই এ্যাম সরি টু সে। আমি স্ট্রিটলি আপনাকে অপোস করতেছি যে, আমার কোন পুলিশের মেম্বার এটার সাথে কখনই জড়িত না। আমাদের পুলিশের রিকশা থেকে ১০ টাকা নেয়ার দিন শেষ। এখন গবর্নমেন্ট আমাদের প্রচুর সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে। এটা আমি মেনে নিতে পারছি না। বাট কমিউনিটি পুলিশের যেটা বলছেন, আমি সেটাও ইয়া করি না। কিন্তু যেহেতু আপনি কমপ্লেইন করেছেন আমি এটা অবজার্ভ করে অবশ্যই হান্ড্রেড পার্সেন্ট আমার সিনিয়র অথোরিথিস্টকে জানাব।’

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: